মদ, সিগারেটের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিরোধীদল মিছিল করেছে- প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে এনসিপির সংসদ সদস্য (এমপি) আবদুল হান্নান মাসউদ অসত্য আখ্যা দেওয়ায় সংসদে বিতর্ক হয়েছে। বিএনপির এমপিরা হান্নান মাসউদের বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি তোলেন। তবে বিরোধী জোট আপত্তি জানায়। তারা প্রশ্ন তোলেন, হান্নানের বক্তব্যের কোন তথ্য অসত্য? প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করতে না পারলে ফ্যাসিবাদ ফিরবে বলে সতর্ক করেন বিরোধীরা। পাল্টা সরকারি দল দাবি করে, বিরোধীদল ফ্যাসিবাদী আচরণ করছে।
আজ রোববার সংসদ বাজেট অধিবেশনের বৈঠকে এই নিয়ে উত্তেজনা ছড়ায়। পরে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেন, ‘সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’
গত ১১ জুন সংসদ বাজেট ঘোষণার পর, জামায়াতে ইসলামী রাজধানী বিক্ষোভ মিছিল করে। যার ব্যানারে লেখা ছিল ‘গণবিরোধী ও লুটপাটের বাজেটের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল’। তবে ফেসবুকে ছড়ানো ফটোকার্ডের ব্যানারে লেখা ছিল ‘বাজেটে বিড়ি, সিগারেট, মদ, গাঁজা ও তামাকজাত দ্রব্যের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল’।
১৩ জুন কক্সবাজার সফরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা দাবি তুলেছে কেন মদের ওপর আমরা ট্যাক্স বাড়ালাম? তারা দাবি তুলেছে, কেন আমরা সিগারেটের ওপর ট্যাক্স বাড়ালাম? এই তাদের দুঃখ। আমরা সামাজিকমাধ্যমসহ বিভিন্ন নিউজে দেখলাম একটি খবর। কী সেই খবর! বিরোধীদল বলছে যে, এই বাজেট তারা মানে না।’
রোববার বাজেট আলোচনায় হান্নান মাসউদ প্রধানমন্ত্রী এই বক্তব্যের প্রসঙ্গে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজকে এখানে নেই। উনি যখন বিভিন্ন ভাষণে অসত্য তথ্য দিয়ে বলেন, বিরোধীদল মিছিল করছে মদের দাম কেন বৃদ্ধি করা হয়েছে? কেন সিগারেটের দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে? এরকম অসত্য তথ্য দিয়ে যখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন, আমরা খুবই আশাহত হই।’
এ সময় সরকারি দলের সংসদ সদস্যরা হইচই করে এর প্রতিবাদ জানান। হান্নান মাসউদ আরও বলেন, ‘‘আমরা আশাহত হই, যখন ব্যাংকঋণ, ব্যাংকদখল নিয়ে কথা বলি, তখন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে বলেন ‘আপনারা সবাই জমিদার যারা ঋণ নেন নাই’- এর মধ্য দিয়ে মূলত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঋণখেলাপিদেরকে উৎসাহিত করেন।’’
সংসদে খ্যাতির বিড়ম্বনা দেখা যাচ্ছে উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের সমালোচনা করেন হান্নান মাসউদ। তিনি বলেন, ‘আগে রাস্তাঘাট, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছিল শেখ মুজিবুর রহমানের নামে। শেখ মুজিবুর রহমান মৃত ছিলেন। উনি হয়তো জানতেন না। কিন্তু এই সংসদেও একজন প্রতিমন্ত্রীর সেই খ্যাতি দেখতে পাচ্ছি। উনি কিছুই জানেন না, কিন্তু ১০–১২টা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম উনার পরিবারের নামে হয়ে যায়। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের নাম পর্যন্ত হয়ে যায়।’
হান্নান মাসউদ বলেন, ‘আমরা এমন এক মিরাকল সংসদে আছি, যে সংসদে ফ্যাসিবাদকে উৎখাত করে এসেছি। সবাই কম বেশি নির্যাতিত। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি যে ভারতের দালালি, যেভাবে আওয়ামী সরকার করত, ঠিক একইভাবে এই সংসদের বিভিন্ন মন্ত্রীরাও একই ধরনের ভারতীয় ভাষায় কথা বলেন। আগে ফ্যাসিবাদী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে বক্তব্য দিতেন, বর্তমানে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একইভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন।’
বিএনপির আপত্তি, বাহাস
হান্নান মাসউদের বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি জানান বিএনপির এমপি জয়নুল আবদিন ফারুক। বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদ নেতাকে কটূক্তি করা হয় এমন বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করা হোক।’
এরপর বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট করে বলতে হবে, হান্নান মাসউদের কোন তথ্য অসত্য। কিন্তু ঢালাওভাবে বলে গেলেন যে, বক্তব্য অসত্য কথা বলা হয়েছে ‘
নাহিদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীও ভুল করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেওয়ার সময় স্লিপ অব টাং হয়েছে। উনি তার ভুল শুধরে নিয়েছেন। উনার বক্তব্যের সমালোচনা করার অধিকারও বিরোধীদলের আছে। তিনি জিয়াউর রহমানের সন্তান, খালেদা জিয়ার সন্তান, প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা; কিন্তু তার মানে এই না যে তাঁকে নিয়ে কোনো কথাই বলা যাবে না। তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করা যাবে না। আমরা গণতন্ত্রের দিকে যেতে চাই। ফ্যাসিবাদের দিকে আবার যেতে চাচ্ছি না।’
এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘বিরোধীদলের চিফ হুইপ যা বলেছেন তা সঠিক নয়। হান্নান মাসউদ সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন যে, সংসদ নেতা, প্রধানমন্ত্রী অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন।’
এ সময় বিরোধীদল হইচই শুরু করলে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমাদের বলতে দিন। আপনারা ফ্যাসিস্টের কথা বলেন, কিন্তু ফ্যাসিস্ট আচরণ তো আপনাদের কাছ থেকে আসছে। আমাদেরকে বলতে দিতে হবে।’
মির্জা ফখরুল দাবি জানান, হান্নান মাসউদের বক্তব্যে যে অংশটুকু অসত্য তা এক্সপাঞ্জ করা হোক।
এ সময় হান্নান মাসউদ কথা বলতে চাইলেও ডেপুটি স্পিকার তাঁকে ফ্লোর দেননি। তারপরও তিনি মাইক ছাড়া কথা বলতে থাকেন। তখন কায়সার কামাল বলেন, ‘এটা শাহবাগ চত্বর নয়। জাতীয় সংসদ।’
এ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ডেপুটি স্পিকারকে বলেন, ‘বাইরের কোনো বিষয়কে টেনে সংসদে টেনে এনে এক্সপাঞ্জ করা বা বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া না হয়।’
ডেস্ক নিউজ 





















