খুলনা নগরজুড়ে বেওয়ারিশ কুকুরের আতঙ্ক, নীরব সিটি কর্পোরেশন


খুলনা নগরজুড়ে দিন দিন বাড়ছে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব। নগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর। এতে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, পথচারী, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

খালিশপুরের পৌরসভার মোড়, নিউজপ্রিন্ট এলাকা, প্লাটিনাম ২ নম্বর গেট, তাইয়্যবা, আলমনগর চারেরহাট ও বিআইডিসি রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে একই চিত্র নগরীর অন্যান্য এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে কেসিসির উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লবণচরা, মোল্লাপাড়া, জিন্নাপাড়া, মাস্টারপাড়া, গল্লামারীসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পথকুকুরের উৎপাতের কথা উঠে আসে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের তুলনায় রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরের দল আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। দলবদ্ধভাবে রাস্তায় অবস্থান নিয়ে পথচারীদের ধাওয়া করা, যানবাহনের পেছনে ছুটে যাওয়া কিংবা হঠাৎ সামনে চলে আসায় আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

খালিশপুরের এক কাঁচা তরকারি বিক্রেতা বলেন, “প্রতিদিন ভোরে আড়তে মাল আনতে যেতে হয়। কুকুরের উপদ্রবের কারণে এখন হাতে লাঠি নিয়ে বের হই। নিজের নিরাপত্তার জন্যই এটা করতে হচ্ছে।”

এক চা-দোকানদার বলেন, “প্রতিদিন রাতে বাসায় ফেরার সময় বেওয়ারিশ কুকুর ঘিরে ধরে। তাই আত্মরক্ষার জন্য স্টিলের পাইপ বানিয়ে রেখেছি। এভাবে কুকুর বাড়তে থাকলে একসময় রাস্তায় চলাচল করাই কঠিন হয়ে যাবে।”

খালিশপুর হাউজিং এলাকার এক বাসিন্দার অভিযোগ, “আমার ছোট বাচ্চা কুকুরের ভয়ে স্কুলে যেতে চায় না। স্কুলের ভেতরেও কুকুরের আনাগোনা দেখা যায়। বাচ্চাদের নিরাপত্তা কোথায়?”

শুধু পথচারী নয়, মোটরসাইকেল চালকরাও পড়ছেন ঝুঁকিতে। স্থানীয়দের দাবি, কুকুরের দল মোটরসাইকেলকে ধাওয়া করলে অনেক চালক দ্রুতগতিতে পালানোর চেষ্টা করেন। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। ২০২৫ সালের কেসিসি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনেও কুকুরের গাড়ি তাড়া করার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

ময়লা-আবর্জনাও বাড়াচ্ছে কুকুরের উৎপাত

কেসিসি-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা পথকুকুরের আনাগোনা বাড়ানোর অন্যতম কারণ। খাবারের সন্ধানে কুকুরগুলো আবর্জনার স্তূপে জড়ো হয় এবং অনেক সময় সেখানেই দলবদ্ধভাবে অবস্থান নেয়। ফলে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নিধন নয়, কার্যকর নিয়ন্ত্রণের দাবি

একসময় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও বর্তমানে প্রাণীকল্যাণ ও আইনি বিষয় বিবেচনায় মানবিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খুলনা নগরীতেও অতীতে কুকুর নিধন বন্ধ হওয়ার পর জন্মনিয়ন্ত্রণ ও টিকাদান কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়ার তথ্য রয়েছে।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন—পরিকল্পনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল কোথায়?

স্থানীয়দের দাবি, কুকুর নিধন নয়; বরং কার্যকর বন্ধ্যাকরণ, টিকাদান, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় কুকুরের দল মানুষের চলাচলে বেশি বাধা সৃষ্টি করছে, সেসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, নগরীর আবর্জনা অপসারণ ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও তাদের মৌলিক কার্যাবলির অংশ।

এ অবস্থায় নগরবাসীর প্রশ্ন—বেওয়ারিশ কুকুরের আতঙ্ক থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেবে খুলনা সিটি কর্পোরেশন?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Deen Md

জ্বালানি সংকট মোকাবেলায় বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

খুলনা নগরজুড়ে বেওয়ারিশ কুকুরের আতঙ্ক, নীরব সিটি কর্পোরেশন

Update Time : ১১:৩৩:২০ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬


খুলনা নগরজুড়ে দিন দিন বাড়ছে বেওয়ারিশ কুকুরের উপদ্রব। নগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে দলবদ্ধভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে কুকুর। এতে নারী, শিশু, শিক্ষার্থী, পথচারী, মোটরসাইকেল ও ইজিবাইক চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।

খালিশপুরের পৌরসভার মোড়, নিউজপ্রিন্ট এলাকা, প্লাটিনাম ২ নম্বর গেট, তাইয়্যবা, আলমনগর চারেরহাট ও বিআইডিসি রোডসহ বিভিন্ন এলাকায় বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত বেশি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তবে একই চিত্র নগরীর অন্যান্য এলাকাতেও দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে কেসিসির উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে লবণচরা, মোল্লাপাড়া, জিন্নাপাড়া, মাস্টারপাড়া, গল্লামারীসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পথকুকুরের উৎপাতের কথা উঠে আসে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের তুলনায় রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুকুরের দল আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। দলবদ্ধভাবে রাস্তায় অবস্থান নিয়ে পথচারীদের ধাওয়া করা, যানবাহনের পেছনে ছুটে যাওয়া কিংবা হঠাৎ সামনে চলে আসায় আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।

খালিশপুরের এক কাঁচা তরকারি বিক্রেতা বলেন, “প্রতিদিন ভোরে আড়তে মাল আনতে যেতে হয়। কুকুরের উপদ্রবের কারণে এখন হাতে লাঠি নিয়ে বের হই। নিজের নিরাপত্তার জন্যই এটা করতে হচ্ছে।”

এক চা-দোকানদার বলেন, “প্রতিদিন রাতে বাসায় ফেরার সময় বেওয়ারিশ কুকুর ঘিরে ধরে। তাই আত্মরক্ষার জন্য স্টিলের পাইপ বানিয়ে রেখেছি। এভাবে কুকুর বাড়তে থাকলে একসময় রাস্তায় চলাচল করাই কঠিন হয়ে যাবে।”

খালিশপুর হাউজিং এলাকার এক বাসিন্দার অভিযোগ, “আমার ছোট বাচ্চা কুকুরের ভয়ে স্কুলে যেতে চায় না। স্কুলের ভেতরেও কুকুরের আনাগোনা দেখা যায়। বাচ্চাদের নিরাপত্তা কোথায়?”

শুধু পথচারী নয়, মোটরসাইকেল চালকরাও পড়ছেন ঝুঁকিতে। স্থানীয়দের দাবি, কুকুরের দল মোটরসাইকেলকে ধাওয়া করলে অনেক চালক দ্রুতগতিতে পালানোর চেষ্টা করেন। এতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়। ২০২৫ সালের কেসিসি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনেও কুকুরের গাড়ি তাড়া করার কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

ময়লা-আবর্জনাও বাড়াচ্ছে কুকুরের উৎপাত

কেসিসি-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলা পথকুকুরের আনাগোনা বাড়ানোর অন্যতম কারণ। খাবারের সন্ধানে কুকুরগুলো আবর্জনার স্তূপে জড়ো হয় এবং অনেক সময় সেখানেই দলবদ্ধভাবে অবস্থান নেয়। ফলে অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে।

নিধন নয়, কার্যকর নিয়ন্ত্রণের দাবি

একসময় বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হলেও বর্তমানে প্রাণীকল্যাণ ও আইনি বিষয় বিবেচনায় মানবিক পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। খুলনা নগরীতেও অতীতে কুকুর নিধন বন্ধ হওয়ার পর জন্মনিয়ন্ত্রণ ও টিকাদান কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়ার তথ্য রয়েছে।

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন—পরিকল্পনা থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল কোথায়?

স্থানীয়দের দাবি, কুকুর নিধন নয়; বরং কার্যকর বন্ধ্যাকরণ, টিকাদান, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় কুকুরের দল মানুষের চলাচলে বেশি বাধা সৃষ্টি করছে, সেসব এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, নগরীর আবর্জনা অপসারণ ও কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও তাদের মৌলিক কার্যাবলির অংশ।

এ অবস্থায় নগরবাসীর প্রশ্ন—বেওয়ারিশ কুকুরের আতঙ্ক থেকে মানুষকে নিরাপদ রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ কবে নেবে খুলনা সিটি কর্পোরেশন?