এখন সেই রোহিঙ্গাদের সহায়তা চায় মিয়ানমার জান্তা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:৫৫:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ এপ্রিল ২০২৪
  • 171


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সাত বছর আগে যে জাতিগত নিধন অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, এখন সেই রোহিঙ্গাদের কাছেই সহায়তা চায় জান্তা। রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গারা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, জান্তার পক্ষে লড়াইয়ের জন্য গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১০০ রোহিঙ্গাকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকার দেওয়া রোহিঙ্গাদের নাম নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিবেদনে পরিবর্তন করেছে বিবিসি। তিন সন্তানের বাবা ৩১ বছর বয়সী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ। তাকেও বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি ভীত ছিলাম। কিন্তু আমাকে তারপরও যেতে হয়েছে।
রাখাইনের রাজধানী সিত্তের কাছের বাও দু ফা অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে বসবাস করেন তিনি। গত এক দশক ধরে মিয়ানমারের দেড় লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এই ধরনের অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছেন।
মোহাম্মদ বলেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের কোনও এক রাতে আশ্রয় শিবিরের নেতা তার কাছে আসেন। ওই নেতাই তাকে জানান, সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাকে বলেন, ‘‘এটা সামরিক বাহিনীর আদেশ। আদেশ না মানলে সামরিক বাহিনী পরিবারের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিয়েছিল।’’
বিবিসি বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সাথে কথা বলেছে। যারা নিশ্চিত করেছেন, সেনা কর্মকর্তারা ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরেছেন এবং তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য রিপোর্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মোহাম্মদের মতো রোহিঙ্গা পুরুষদের জন্য চরম পরিহাস হলো, মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা এখনও নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত। নিজ সম্প্রদায়ের এলাকার বাইরে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধের শিকার তারা। রাখাইনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে মিলেমিশে বসবাস করলেও ২০১২ সালের সামরিক অভিযানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হন। তারা সেখানকার অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হন।
পাঁচ বছর পর ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংস নিধন অভিযান পরিচালনা করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ওই অভিযানে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশি বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। অভিযানে রোহিঙ্গাদের নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এখনও ৬ লাখের মতো রোহিঙ্গা রাখাইনে রয়েছেন।
রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর দায়ে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার বিচারের মুখোমুখি হয়েছে মিয়ানমার। সম্প্রতি জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির কাছে রাখাইনে বিশাল এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সামরিক বাহিনী। এখন ওই এলাকায় রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক নিয়োগ দিচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এসবই সেনাবাহিনীর হতাশার লক্ষণ। রাখাইনে সেনাবাহিনীর কামান ও বিমান হামলায় কয়েক ডজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে রোহিঙ্গাদের দিকে ঝুঁকছে সামরিক বাহিনী। রোহিঙ্গাদের জোর করে বাহিনীতে যুক্ত করার চেষ্টা করছে তারা। আর এটা কেবল রাখাইনেই নয় বরং দেশের আরও কয়েকটি স্থানেও যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে জান্তা বাহিনী। অনেক সেনা সদস্য হতাহত হওয়ার পাশাপাশি আত্মসমর্পণও করেছে। কিছু সেনা সদস্য পক্ষ ত্যাগ করে বিদ্রোহীদের দলেও যোগ দিয়েছে। এখন তাদের শূন্য স্থান পূরণ করা সেনাবাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কারণেই হয়ত কামানের গোলার মুখে ঠেলে দিতে তাদের আবারও লক্ষ্যে পরিণত করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন রোহিঙ্গারা। মোহাম্মদ বলেছেন, তাকে সিত্তের ২৭০ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। বন্দুকে গুলি ভরা এবং ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আমাদেরকে। বন্দুকের বিভিন্ন অংশ খোলা ও ফের সংযোজন কীভাবে করতে হয় তাও দেখিয়েছে।
মোহাম্মদকে দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই দিন পরই তাকে ডেকে পাঠানো হয়। এরপর ২৫০ জন সেনা সদস্যের সঙ্গে তাকে একটি জলযানে করে নদীপথে রাথেডং শহরে নেওয়া হয়। সেখানে সেই সময় পাহাড়ের ওপরে তিনটি সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াই চলছিল।
তিনি বলেন, আমি কেন লড়াই করছি বুঝতে পারছিলাম না। তারা যখন একটি রাখাইন গ্রামের দিকে গুলি করতে বলে আমি গুলি করি। ওই এলাকায় ১১ দিন ধরে লড়াইয়ে ছিলেন তিনি। তদের রসদ ভাণ্ডারে একটি গোলা এসে পড়ার পর থেকে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েন তারা। এ সময় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা যোদ্ধাকে মরতে দেখেন তিনি। একসময় নিজেও আহত হন, তার দুই পায়ে গোলার আঘাত লাগে। চিকিৎসার জন্য সিত্তওয়েতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে
যুদ্ধে মোহাম্মদ আহত হন। তার উভয় পায়ে গোলা বা গুলির টুকরার আঘাত লাগে। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য সিত্তেতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তার মতো আরও অনেক রোহিঙ্গাকে জান্তাবিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাধ্য করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তবে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করার কথা অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Din Mohammad

জনপ্রিয়

বিএনপি নেতাদের নামে অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ বহিষ্কৃত এনসিপি নেতার বিরুদ্ধে

এখন সেই রোহিঙ্গাদের সহায়তা চায় মিয়ানমার জান্তা

Update Time : ০৮:৫৫:১৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ৮ এপ্রিল ২০২৪


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সাত বছর আগে যে জাতিগত নিধন অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, এখন সেই রোহিঙ্গাদের কাছেই সহায়তা চায় জান্তা। রাখাইন প্রদেশে বসবাসরত রোহিঙ্গারা ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, জান্তার পক্ষে লড়াইয়ের জন্য গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ১০০ রোহিঙ্গাকে বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিযুক্ত করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকার দেওয়া রোহিঙ্গাদের নাম নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিবেদনে পরিবর্তন করেছে বিবিসি। তিন সন্তানের বাবা ৩১ বছর বয়সী রোহিঙ্গা মোহাম্মদ। তাকেও বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে নিয়োগ করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমি ভীত ছিলাম। কিন্তু আমাকে তারপরও যেতে হয়েছে।
রাখাইনের রাজধানী সিত্তের কাছের বাও দু ফা অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে বসবাস করেন তিনি। গত এক দশক ধরে মিয়ানমারের দেড় লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এই ধরনের অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে বসবাস করছেন।
মোহাম্মদ বলেন, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ের কোনও এক রাতে আশ্রয় শিবিরের নেতা তার কাছে আসেন। ওই নেতাই তাকে জানান, সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে তাকে বলেন, ‘‘এটা সামরিক বাহিনীর আদেশ। আদেশ না মানলে সামরিক বাহিনী পরিবারের ক্ষতি করবে বলে হুমকি দিয়েছিল।’’
বিবিসি বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গার সাথে কথা বলেছে। যারা নিশ্চিত করেছেন, সেনা কর্মকর্তারা ক্যাম্পের চারপাশে ঘুরেছেন এবং তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য রিপোর্ট করার নির্দেশ দিয়েছেন।
মোহাম্মদের মতো রোহিঙ্গা পুরুষদের জন্য চরম পরিহাস হলো, মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা এখনও নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত। নিজ সম্প্রদায়ের এলাকার বাইরে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো বৈষম্যমূলক বিধিনিষেধের শিকার তারা। রাখাইনে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাথে মিলেমিশে বসবাস করলেও ২০১২ সালের সামরিক অভিযানে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হন। তারা সেখানকার অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে বসবাস করতে বাধ্য হন।
পাঁচ বছর পর ২০১৭ সালের আগস্টে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নৃশংস নিধন অভিযান পরিচালনা করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। ওই অভিযানে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা প্রতিবেশি বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। অভিযানে রোহিঙ্গাদের নির্বিচার হত্যা, ধর্ষণ ও বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এখনও ৬ লাখের মতো রোহিঙ্গা রাখাইনে রয়েছেন।
রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন চালানোর দায়ে হেগের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার বিচারের মুখোমুখি হয়েছে মিয়ানমার। সম্প্রতি জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির কাছে রাখাইনে বিশাল এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে সামরিক বাহিনী। এখন ওই এলাকায় রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক নিয়োগ দিচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এসবই সেনাবাহিনীর হতাশার লক্ষণ। রাখাইনে সেনাবাহিনীর কামান ও বিমান হামলায় কয়েক ডজন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে রোহিঙ্গাদের দিকে ঝুঁকছে সামরিক বাহিনী। রোহিঙ্গাদের জোর করে বাহিনীতে যুক্ত করার চেষ্টা করছে তারা। আর এটা কেবল রাখাইনেই নয় বরং দেশের আরও কয়েকটি স্থানেও যুদ্ধে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছে জান্তা বাহিনী। অনেক সেনা সদস্য হতাহত হওয়ার পাশাপাশি আত্মসমর্পণও করেছে। কিছু সেনা সদস্য পক্ষ ত্যাগ করে বিদ্রোহীদের দলেও যোগ দিয়েছে। এখন তাদের শূন্য স্থান পূরণ করা সেনাবাহিনীর জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কারণেই হয়ত কামানের গোলার মুখে ঠেলে দিতে তাদের আবারও লক্ষ্যে পরিণত করা হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন রোহিঙ্গারা। মোহাম্মদ বলেছেন, তাকে সিত্তের ২৭০ লাইট ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে। বন্দুকে গুলি ভরা এবং ছোড়ার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে আমাদেরকে। বন্দুকের বিভিন্ন অংশ খোলা ও ফের সংযোজন কীভাবে করতে হয় তাও দেখিয়েছে।
মোহাম্মদকে দুই সপ্তাহের প্রশিক্ষণ শেষে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুই দিন পরই তাকে ডেকে পাঠানো হয়। এরপর ২৫০ জন সেনা সদস্যের সঙ্গে তাকে একটি জলযানে করে নদীপথে রাথেডং শহরে নেওয়া হয়। সেখানে সেই সময় পাহাড়ের ওপরে তিনটি সামরিক ঘাঁটির নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আরাকান আর্মির সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র লড়াই চলছিল।
তিনি বলেন, আমি কেন লড়াই করছি বুঝতে পারছিলাম না। তারা যখন একটি রাখাইন গ্রামের দিকে গুলি করতে বলে আমি গুলি করি। ওই এলাকায় ১১ দিন ধরে লড়াইয়ে ছিলেন তিনি। তদের রসদ ভাণ্ডারে একটি গোলা এসে পড়ার পর থেকে তীব্র খাদ্য সংকটে পড়েন তারা। এ সময় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা যোদ্ধাকে মরতে দেখেন তিনি। একসময় নিজেও আহত হন, তার দুই পায়ে গোলার আঘাত লাগে। চিকিৎসার জন্য সিত্তওয়েতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে
যুদ্ধে মোহাম্মদ আহত হন। তার উভয় পায়ে গোলা বা গুলির টুকরার আঘাত লাগে। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য সিত্তেতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। তার মতো আরও অনেক রোহিঙ্গাকে জান্তাবিরোধীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বাধ্য করছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তবে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করার কথা অস্বীকার করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী।