সুন্দরবনের ৬ হাজার কিলোমিটারজুড়ে ১৬ বাহিনীর দাপট, আতঙ্কে উপকূলের মানুষ


সুন্দরবনের বুকজুড়ে আবারও ফিরেছে দস্যু আতঙ্ক। নদী-খাল আর গভীর বনাঞ্চলে একের পর এক জেলে অপহরণের ঘটনায় পুরো উপকূল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। জীবিকার তাগিদে যারা প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে নদীতে নামেন, এখন তারাই হয়ে উঠছেন দস্যুদের প্রধান টার্গেট।

সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২২ জেলেকে অপহরণের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বনজীবীদের মাঝে। অপহৃতদের পরিবারগুলোর অনেক ঘরেই এখন চুলা জ্বলছে না। স্বজনদের কান্না আর উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে উপকূলের জনপদ।

২০১৮ সালে সরকারিভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরোনো ও নতুন দস্যু বাহিনী। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতির অবনতি আরও বেড়েছে বলে দাবি তাদের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সুন্দরবনের প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ও বনাঞ্চলে অন্তত ১৬টি ছোট-বড় দস্যু বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে। এর মধ্যে করিম-শরীফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, বুড়ো জাহাঙ্গীর বাহিনী, সবুজ-জাহাঙ্গীর বাহিনী, আল-আমীন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী ও আসাবুর গ্রুপের নাম বেশি আলোচনায় এসেছে।

দস্যুরা গভীর বনাঞ্চলকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে সুযোগ বুঝে জেলে ও বনজীবীদের ট্রলার থামিয়ে অপহরণ করছে। পরে তাদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। মুক্তিপণ না পেলে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
দস্যু আতঙ্কে শুধু জেলেরা নন, ক্ষতির মুখে পড়ছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন খাতও। বিভিন্ন সময়ে পর্যটকবাহী ট্রলার ও রিসোর্ট এলাকায় ডাকাতির চেষ্টার খবর পাওয়ায় পর্যটকদের মাঝেও বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পর্যটন শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে ৬১ জন দস্যুকে আটক এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযান নয়—স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থাই পারে দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ করতে।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার জেলে মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “নদীতে না গেলে পরিবার না খেয়ে থাকবে। আবার নদীতে গেলেও ভয়—ফিরে আসতে পারবো তো? প্রায়ই শুনি কাউকে না কাউকে তুলে নিয়ে গেছে ডাকাতরা।”
দাকোপ উপজেলার সুতারখালী এলাকার অরিবিন্দু মণ্ডল বলেন, “বাঘ, সাপ আর কুমিরের ভয় নিয়েই বনে যাই। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় ভয় ডাকাত। ডাকাতের হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।”

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবন যদি দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তাহলে তা শুধু উপকূল নয়, পুরো দেশের জন্যই অশনিসংকেত।”

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, “অনেক ঘটনায় থানায় অভিযোগ না হওয়ায় ব্যবস্থা নিতে জটিলতা তৈরি হয়। জেলেদেরও প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে।”

এদিকে ‘বিপদমুক্ত নৌযাত্রা, জানমালের সুরক্ষা’ স্লোগানে দেশে শুরু হয়েছে নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ। তবে উপকূলবাসীর প্রশ্ন—এই কর্মসূচি কি সত্যিই সুন্দরবনের দস্যু আতঙ্ক কমাতে পারবে, নাকি আবারও কোনো জেলের পরিবার অপেক্ষা করবে মুক্তিপণের ফোনকলের?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Deen Md

সৌদি আরবে ঈদুল আজহার সম্ভাব্য তারিখ জানা যাবে রোববার

সুন্দরবনের ৬ হাজার কিলোমিটারজুড়ে ১৬ বাহিনীর দাপট, আতঙ্কে উপকূলের মানুষ

Update Time : ০১:০০:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬


সুন্দরবনের বুকজুড়ে আবারও ফিরেছে দস্যু আতঙ্ক। নদী-খাল আর গভীর বনাঞ্চলে একের পর এক জেলে অপহরণের ঘটনায় পুরো উপকূল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে ভয়, উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা। জীবিকার তাগিদে যারা প্রতিদিন জীবন বাজি রেখে নদীতে নামেন, এখন তারাই হয়ে উঠছেন দস্যুদের প্রধান টার্গেট।

সম্প্রতি সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ২২ জেলেকে অপহরণের ঘটনায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বনজীবীদের মাঝে। অপহৃতদের পরিবারগুলোর অনেক ঘরেই এখন চুলা জ্বলছে না। স্বজনদের কান্না আর উৎকণ্ঠায় ভারী হয়ে উঠেছে উপকূলের জনপদ।

২০১৮ সালে সরকারিভাবে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, গত কয়েক বছরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরোনো ও নতুন দস্যু বাহিনী। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে পরিস্থিতির অবনতি আরও বেড়েছে বলে দাবি তাদের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সুন্দরবনের প্রায় ৬ হাজার কিলোমিটার নদীপথ ও বনাঞ্চলে অন্তত ১৬টি ছোট-বড় দস্যু বাহিনীর তৎপরতা রয়েছে। এর মধ্যে করিম-শরীফ বাহিনী, নানা ভাই বাহিনী, ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী, ছোট সুমন বাহিনী, আলিফ বাহিনী, বুড়ো জাহাঙ্গীর বাহিনী, সবুজ-জাহাঙ্গীর বাহিনী, আল-আমীন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, জনাব বাহিনী ও আসাবুর গ্রুপের নাম বেশি আলোচনায় এসেছে।

দস্যুরা গভীর বনাঞ্চলকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করে সুযোগ বুঝে জেলে ও বনজীবীদের ট্রলার থামিয়ে অপহরণ করছে। পরে তাদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। মুক্তিপণ না পেলে নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে।
দস্যু আতঙ্কে শুধু জেলেরা নন, ক্ষতির মুখে পড়ছে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন খাতও। বিভিন্ন সময়ে পর্যটকবাহী ট্রলার ও রিসোর্ট এলাকায় ডাকাতির চেষ্টার খবর পাওয়ায় পর্যটকদের মাঝেও বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা।

পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দ্রুত নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পর্যটন শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়বে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত দেড় বছরে বিভিন্ন অভিযানে ৬১ জন দস্যুকে আটক এবং বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু অভিযান নয়—স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থাই পারে দস্যুতা নিয়ন্ত্রণ করতে।

কয়রা উপজেলার দক্ষিণ বেদকাশি এলাকার জেলে মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, “নদীতে না গেলে পরিবার না খেয়ে থাকবে। আবার নদীতে গেলেও ভয়—ফিরে আসতে পারবো তো? প্রায়ই শুনি কাউকে না কাউকে তুলে নিয়ে গেছে ডাকাতরা।”
দাকোপ উপজেলার সুতারখালী এলাকার অরিবিন্দু মণ্ডল বলেন, “বাঘ, সাপ আর কুমিরের ভয় নিয়েই বনে যাই। কিন্তু এখন সবচেয়ে বড় ভয় ডাকাত। ডাকাতের হাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।”

বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা খুলনার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম বলেন, “সুন্দরবন যদি দস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়, তাহলে তা শুধু উপকূল নয়, পুরো দেশের জন্যই অশনিসংকেত।”

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন, “অনেক ঘটনায় থানায় অভিযোগ না হওয়ায় ব্যবস্থা নিতে জটিলতা তৈরি হয়। জেলেদেরও প্রশাসনকে সহযোগিতা করতে হবে।”

এদিকে ‘বিপদমুক্ত নৌযাত্রা, জানমালের সুরক্ষা’ স্লোগানে দেশে শুরু হয়েছে নৌ নিরাপত্তা সপ্তাহ। তবে উপকূলবাসীর প্রশ্ন—এই কর্মসূচি কি সত্যিই সুন্দরবনের দস্যু আতঙ্ক কমাতে পারবে, নাকি আবারও কোনো জেলের পরিবার অপেক্ষা করবে মুক্তিপণের ফোনকলের?