খুলনায় একের পর এক গুলি, হত্যাকাণ্ড ও সশস্ত্র হামলার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। কখনো বাড়ির সামনে, কখনো সড়কে, কখনো নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার শিকার হচ্ছেন মানুষ। রাজনৈতিক পরিচয়ধারী নেতা থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও সাধারণ কর্মজীবী—বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর এসব হামলার ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খুলনা নগরী ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় গুলিতে আহত হয়েছেন তিনজন। তাঁদের মধ্যে দুজন যুবদল নেতা এবং অন্যজন একটি সিগারেট কোম্পানির কর্মী। সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত থেকে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেল পর্যন্ত এসব ঘটনা ঘটে। এর আগে আগস্ট থেকে অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে একাধিক হত্যাকাণ্ড, গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ও সশস্ত্র হামলার খবর পাওয়া গেছে।
২৪ ঘণ্টায় গুলিতে আহত তিনজন
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে খুলনা নগরের নিরালা আবাসিক এলাকার ১৭ নম্বর সড়কে তামান্না টাওয়ারের দক্ষিণ পাশে নাসিম ট্রেডার্সের সামনে গুলিবিদ্ধ হন সালমান (২৩)। তিনি ক্যামেল সিগারেট কোম্পানির পিয়ন হিসেবে কর্মরত। তাঁর পেটের ডান পাশে গুলি লাগে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুটি মোটরসাইকেলে আসা চার দুর্বৃত্ত তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পরে তাঁর সঙ্গে থাকা ল্যাপটপের ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
একই দিন বিকেল ৫টা থেকে সাড়ে ৫টার মধ্যে বটিয়াঘাটা উপজেলার চক্রাখালী বাজারের একটি চায়ের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন যুবদল নেতা মোহাম্মদ ওয়াহিদুল ইসলাম বাদল। প্রত্যক্ষদর্শী ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পালিয়ে যায়। পরে আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বাদল বটিয়াঘাটা উপজেলার ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সাবেক সভাপতি। তিনি ১ নম্বর জলমা ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি পদপ্রার্থী। তাঁর বাবার নাম আলতাফ হাওলাদার।
এ ছাড়া সোমবার (২৬ অক্টোবর) দিবাগত রাতে বটিয়াঘাটায় গুলিতে আহত হন আমিরপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি সোহেল শেখ। তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা বাদলের ঘটনার আগের রাতে ঘটে।
খুলনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সি সার্কেল) মো. সালাউদ্দিন ঘটনাগুলোর সত্যতা স্বীকার করে জানান, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ কাজ করছে।
১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দুই খুন
গত ২২ অক্টোবর খুলনায় প্রায় ১৪ ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে নিহত হন দুজন। ওই দিন ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে নগরের মিস্ত্রিপাড়া বাজারসংলগ্ন আনসার উদ্দিন লেন এলাকায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তুষার (২৭) নামের এক যুবকের মরদেহ পাওয়া যায়। একই দিন সন্ধ্যায় লবণচরা এলাকায় গুলি ও ধারালো অস্ত্রের হামলায় নিহত হন খুশি বেগম (২৪)।
এর আগে ২০ অক্টোবর রাতে নগরের সোনাডাঙ্গা থানাধীন সিঅ্যান্ডবি কলোনির একটি পরিত্যক্ত ভবন থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
খানজাহান আলী থানা এলাকায় চোর সন্দেহে মারধরের শিকার হয়ে নিহত হন সম্রাট ঢালী (৩৫)। অভিযোগ রয়েছে, মীরেরডাঙ্গা এলাকার একটি জুট মিলের নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে মারধর করেন।
নিরাপত্তা চেয়েও রক্ষা পাননি আক্তার ঢালি
খুলনায় সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে আলোচনায় এসেছে রূপসার আক্তার ঢালির ঘটনা। ছেলে জয় ঢালি হত্যার মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। কিন্তু জিডি করার ১৫ দিনের মাথায় গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাঁকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
গত ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী এলাকায় জয় ঢালিকে হত্যা করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় তাঁর মা নাসিমা বেগম ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। স্বজনদের অভিযোগ, মামলার কয়েকজন আসামি জামিনে এলাকায় ফিরে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দিচ্ছিলেন।
নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করার পরও আক্তার ঢালির হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।
বডিগার্ড সঙ্গে থাকলেও বাঁচেননি নাসিম
গত ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ার ফরমাইশখানায় নিজ বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম (৪৫)। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে অস্ত্রধারী বডিগার্ড থাকতেন। তারপরও হামলা থেকে রক্ষা পাননি তিনি।
এর আগে ৭ অক্টোবর সকালে দৌলতপুরের সরকারি ব্রজলাল কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম। আনুমানিক সকাল সাতটার দিকে তাঁকে গুলি করা হয়। পরে তাঁকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
গত ১১ আগস্ট রূপসার নৈহাটি ইউনিয়নের একটি ইটভাটার অফিসের সামনে গুলিতে নিহত হন ফখরুল শেখ (৩২)। ১৮ আগস্ট রাতে একই এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মামুন মীর (৩৫)। ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকার ৩৫ দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়। একই রাতে নগরের রায়েরমহল এলাকায় শিশু অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত হন রাজু (২৬)।
১৯ আগস্ট লবণচরার আশীবিঘা এলাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে নিহত হন মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল (১৮)। ২৮ সেপ্টেম্বর ভোরে রূপসার ইলাইপুর গ্রামের মোমিনবাগ এলাকায় একটি মাছের ঘের থেকে বাপ্পি (৩৫) ওরফে কলম বাপ্পির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এসব ঘটনায় ব্যক্তিগত বিরোধ, আধিপত্যের দ্বন্দ্ব ও অন্যান্য অপরাধের অভিযোগ সামনে এলেও প্রতিটি ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
ক্লিনিকে হামলা, ভাঙচুর ও ফাঁকা গুলি
গত ২৫ অক্টোবর রাতে নগরের বাবু খান রোডে সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালায় মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। রাত সোয়া নয়টার দিকে ৮ থেকে ১০ জনের একটি দল ক্লিনিকে ঢুকে কাচ, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাব ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় ক্লিনিকের এক কর্মকর্তা আহত হন।
ক্লিনিকের রিপোর্ট প্রদানকারী এক কর্মীর মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সিসিটিভি ফুটেজে হামলাকারীদের ক্লিনিকে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালাতে দেখা গেছে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় তারা বাইরে একটি ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এতে আশপাশের মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং পুলিশ সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখছে।
জেলায় ৩৫ হত্যাকাণ্ড
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, একই সময়ের মধ্যে খুলনা জেলায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে জমিজমা ও সামাজিক বিরোধ, মাদক-সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক বিরোধ এবং পারিবারিক কলহসহ বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে।
মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড এবং গুলির ঘটনা অপরাধের ধরন, কারণ ও প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে প্রকাশ্যে হামলা, আগে থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ এবং সন্দেহের ভিত্তিতে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের প্রশ্ন
একদিকে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় জিডি করার পরও হত্যাকাণ্ড, অন্যদিকে ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে গুলি—এসব ঘটনা অপরাধ প্রতিরোধে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। একই সঙ্গে সড়কে চলাচলকারী কর্মজীবী মানুষ, নিজ দোকানে বসে থাকা ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তিদের ওপর হামলার ঘটনা জনমনে আতঙ্ক তৈরি করছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রতিটি হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনার দ্রুত তদন্ত, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। পাশাপাশি আগে থেকে হুমকি পাওয়ার অভিযোগ থাকা ব্যক্তি ও পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মামলার আসামিদের জামিন-পরবর্তী কর্মকাণ্ড আইন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
খুলনায় এখন প্রশ্ন শুধু কতজন নিহত বা গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো, প্রকাশ্যে এমন হামলা ঠেকাতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া যাচ্ছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনা সেই প্রশ্নকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















