বরিশালের আদালতপাড়া বুধবার সকাল থেকে আর পাঁচটা দিনের মতো ছিল না। কাঠের বেঞ্চ, ফাইলের স্তূপ আর নীরবতার জায়গা দখল করে নেয় স্লোগান, উত্তেজনা আর মুখোমুখি অবস্থান।
বিচারকের উপস্থিতিতে এজলাসে অশোভন আচরণ ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগে করা মামলায় বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সাদিকুর রহমান লিংকনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁর সঙ্গে নাম এসেছে আরও অন্তত ২০ জন আইনজীবীর।
গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আদালত চত্বরে জড়ো হন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা। শুরু হয় বিক্ষোভ, কার্যত বন্ধ হয়ে যায় জেলার অধিকাংশ আদালতের বিচারিক কার্যক্রম।
এজলাস থেকে হাজতখানা
বুধবার দুপুরে আদালত চত্বর থেকেই লিংকনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের নিচতলার মেট্রো হাজতখানায় পাঠানো হয়। সেই ফটক ঘিরেই অবস্থান নেন বিক্ষোভকারীরা। ভেতরে ঢোকা বা বেরোনো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিক্ষোভে ভেসে আসে স্লোগান
“সভাপতির মুক্তি দিতে হবে”,
“অবৈধ গ্রেপ্তার মানি না”,
“জিয়ার সৈনিক এক হও, লড়াই কর।”
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (এপিপি) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, সভাপতিকে তাঁর চেয়ার থেকেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের বিচারক তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
মামলার প্রেক্ষাপট
মামলার বাদী অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাজিব মজুমদার। সাক্ষীর তালিকায় রয়েছেন আদালতের নাজির, কোর্ট ইন্সপেক্টর, একাধিক থানার জিআরও, স্টেনোগ্রাফার ও অফিস সহায়করা।
অভিযোগ, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরীয়তউল্লাহের এজলাসে বিচার চলাকালে আসামিরা হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। এই ঘটনায় আসামীদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইনে মামলা দায়ের হয়েছে।
কেন এই উত্তেজনা
ঘটনার শিকড় সোমবারের একটি জামিন আদেশে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, একাধিক মামলার আসামি তালুকদার মো. ইউনুস ও কাজী মনিরুল ইসলামকে জামিন দেন অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।
এর আগে জামিন পান সাবেক সংসদ সদস্য জেবুন্নেছা আফরোজ, মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি জসিম উদ্দিন এবং যুবলীগ নেতা মাহমুদুল হক খান মামুন।
মঙ্গলবার রাতে সাদিকুর রহমান লিংকনের বক্তব্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে। তিনি দাবি করেন, আগেই জানানো হয়েছিল যে ইউনুসকে জামিন দেওয়া হবে। জামিন না দেওয়ার অনুরোধ জানানো হলেও তা মানা হয়নি।
তাঁর অভিযোগ, বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এই জামিন দেওয়া হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ তখনও সামনে আসেনি।
আদালত বর্জন, কড়া হুঁশিয়ারি
এদিকে বুধবার সকাল থেকেই জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ব্যানারে আদালত বর্জন কর্মসূচি শুরু হয়। ফোরামের সদস্যসচিব আবুল কালাম আজাদ বলেন, এটি প্রতীকী কর্মসূচি। ভবিষ্যতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা না হলে আরও কঠোর কর্মসূচির কথাও জানান তিনি।
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আদালতপাড়ায় চাপা উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হয়। একদিকে বিচার বিভাগের মর্যাদা ও শৃঙ্খলার প্রশ্ন, অন্যদিকে রাজনৈতিক পক্ষপাত ও গ্রেপ্তারের অভিযোগ।
এই টানাপোড়েনে এখন স্থবির বরিশালের আদালত অঙ্গন। সামনে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে আছে দেশবাসী।
ডেস্ক নিউজ 

























