পুলিশ সেজে ট্রেনে যাত্রীকে জরিমানা, টাকা না পেয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০১:৫৬:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • 9

ভারতের বিহারে পুলিশ, রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরপিএফ) ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) কর্মকর্তা সেজে ট্রেনে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক যাত্রীকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

গ্রেফতার ব্যক্তির নাম রোহিত তিওয়ারি। ২৫ বছর বয়সি এই যুবক বিহারের ভোজপুর জেলার বারিসওয়ান গ্রামের বাসিন্দা। অভিযোগ, তিনি যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রতিবন্ধীবান্ধব কামরায় উঠে নিজেকে পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। এরপর ধূমপান কিংবা টিকিট-সংক্রান্ত অপরাধের কথা বলে যাত্রীদের কাছ থেকে জরিমানার নামে টাকা আদায় করতেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধরও করতেন তিনি। শ্রমিক ও তরুণ যাত্রীরাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে ২১ বছর বয়সি নিতিন কুমারের নিখোঁজ হওয়ার পর। বৈশালী জেলার বাসিন্দা নিতিন হায়দরাবাদে শ্রমিকের কাজ করতেন। বাড়ি ফেরার পথে তিনি ০৭০৯১ নম্বর হায়দরাবাদ-দানাপুর বিশেষ ট্রেনে ছিলেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নিতিন পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, সিগারেট খাওয়ার অভিযোগে কয়েকজন নিজেদের পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিয়েছে। তিনি তখন বক্সার স্টেশনের কাছে রয়েছেন বলেও জানান। পরে ওই ব্যক্তিরা নিতিনের ফোন নিয়ে তার পরিবারের কাছে ১০ হাজার রুপি দাবি করে।

পরিবারের সদস্যরা পরদিন সকালে টাকা দেওয়ার কথা জানিয়ে নিতিনের অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার রুপি পাঠান। ২১ সেপ্টেম্বর সকালে নিতিনের ফোন থেকেই আবার ২০ হাজার রুপি দাবি করা হয়। এরপর সারা দিন ওই নম্বর থেকে একাধিকবার ফোন এলেও পরিবারের সদস্যরা নিতিনের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি।

এতে সন্দেহ হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা গ্রামের প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে বক্সার রেলওয়ে থানায় যান এবং অভিযোগ করেন। পরে দানাপুর রেলওয়ের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (ডিএসপি) কাঞ্চন রাজের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।

প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে অভিযান শুরু করে। পরে বক্সার ও বারাণসীর মধ্যবর্তী মোহনসরাই এলাকা থেকে রোহিত তিওয়ারিকে গ্রেফতার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে রোহিত অপরাধের কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরা ও জগজীবন হল্টের মধ্যবর্তী রেললাইনের পাশ থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিতিনের বাবা মুকেশ রাই মরদেহটি তার ছেলের বলে শনাক্ত করেন।

পুলিশের দাবি, নিতিনের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে রোহিত তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরেই রোহিত একই ধরনের অপরাধ করে আসছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে যাত্রীদের ভয় দেখিয়ে জরিমানার নামে টাকা আদায় করতেন তিনি।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোহিতের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে। শাহপুর থানায় চুরির মামলা, বক্সার রেলওয়ে থানায় একটি মামলা এবং গত ৯ সেপ্টেম্বর দানাপুর রেলওয়ে থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় তার সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে প্রায় ২৫ মাস কারাগারে ছিলেন রোহিত। দুই মাস আগে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ।

গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে একটি বাদামি রঙের মানিব্যাগ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, মানিব্যাগটি কৈলাশ কুমার নামে এক ব্যক্তির। এতে এটিএম কার্ড, প্যান কার্ড, প্রতিবন্ধী সনদ ও ভোটার পরিচয়পত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রোহিতের নিজের আধার কার্ডও উদ্ধার করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

পাটনা সরকারি রেলওয়ে পুলিশের ডিএসপি কাঞ্চন রাজ বলেন, ‘একজন ধূর্ত অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ট্রেন থেকে এক যুবককে ধাক্কা দিয়ে হত্যার ঘটনায় সে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। আগের কয়েকটি মামলাতেও সে পলাতক ছিল। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Deen Md

অজ্ঞাত নম্বর থেকে অপ্রতিমের বাবা-মাকে হুমকি, থানায় জিডি

পুলিশ সেজে ট্রেনে যাত্রীকে জরিমানা, টাকা না পেয়ে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা

Update Time : ০১:৫৬:১২ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতের বিহারে পুলিশ, রেলওয়ে প্রোটেকশন ফোর্স (আরপিএফ) ও স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের (এসটিএফ) কর্মকর্তা সেজে ট্রেনে যাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগে এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এক যাত্রীকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে হত্যার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

গ্রেফতার ব্যক্তির নাম রোহিত তিওয়ারি। ২৫ বছর বয়সি এই যুবক বিহারের ভোজপুর জেলার বারিসওয়ান গ্রামের বাসিন্দা। অভিযোগ, তিনি যাত্রীবাহী ট্রেনের প্রতিবন্ধীবান্ধব কামরায় উঠে নিজেকে পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তা পরিচয় দিতেন। এরপর ধূমপান কিংবা টিকিট-সংক্রান্ত অপরাধের কথা বলে যাত্রীদের কাছ থেকে জরিমানার নামে টাকা আদায় করতেন। কেউ টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধরও করতেন তিনি। শ্রমিক ও তরুণ যাত্রীরাই ছিল তার মূল লক্ষ্য।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে ২১ বছর বয়সি নিতিন কুমারের নিখোঁজ হওয়ার পর। বৈশালী জেলার বাসিন্দা নিতিন হায়দরাবাদে শ্রমিকের কাজ করতেন। বাড়ি ফেরার পথে তিনি ০৭০৯১ নম্বর হায়দরাবাদ-দানাপুর বিশেষ ট্রেনে ছিলেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নিতিন পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, সিগারেট খাওয়ার অভিযোগে কয়েকজন নিজেদের পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিয়েছে। তিনি তখন বক্সার স্টেশনের কাছে রয়েছেন বলেও জানান। পরে ওই ব্যক্তিরা নিতিনের ফোন নিয়ে তার পরিবারের কাছে ১০ হাজার রুপি দাবি করে।

পরিবারের সদস্যরা পরদিন সকালে টাকা দেওয়ার কথা জানিয়ে নিতিনের অ্যাকাউন্টে ৫ হাজার রুপি পাঠান। ২১ সেপ্টেম্বর সকালে নিতিনের ফোন থেকেই আবার ২০ হাজার রুপি দাবি করা হয়। এরপর সারা দিন ওই নম্বর থেকে একাধিকবার ফোন এলেও পরিবারের সদস্যরা নিতিনের সঙ্গে কথা বলতে পারেননি।

এতে সন্দেহ হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা গ্রামের প্রধানকে সঙ্গে নিয়ে বক্সার রেলওয়ে থানায় যান এবং অভিযোগ করেন। পরে দানাপুর রেলওয়ের ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ (ডিএসপি) কাঞ্চন রাজের নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করা হয়।

প্রযুক্তিগত তথ্য ও গোয়েন্দা সূত্রের ভিত্তিতে পুলিশ সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে অভিযান শুরু করে। পরে বক্সার ও বারাণসীর মধ্যবর্তী মোহনসরাই এলাকা থেকে রোহিত তিওয়ারিকে গ্রেফতার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে রোহিত অপরাধের কথা স্বীকার করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরা ও জগজীবন হল্টের মধ্যবর্তী রেললাইনের পাশ থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিতিনের বাবা মুকেশ রাই মরদেহটি তার ছেলের বলে শনাক্ত করেন।

পুলিশের দাবি, নিতিনের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে ব্যর্থ হয়ে রোহিত তাকে চলন্ত ট্রেন থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেন। তদন্তে আরও উঠে এসেছে, দীর্ঘদিন ধরেই রোহিত একই ধরনের অপরাধ করে আসছিলেন। পুলিশ কর্মকর্তা পরিচয়ে যাত্রীদের ভয় দেখিয়ে জরিমানার নামে টাকা আদায় করতেন তিনি।

রেলওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোহিতের বিরুদ্ধে আগেও একাধিক মামলা রয়েছে। শাহপুর থানায় চুরির মামলা, বক্সার রেলওয়ে থানায় একটি মামলা এবং গত ৯ সেপ্টেম্বর দানাপুর রেলওয়ে থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় তার সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, এর আগে প্রায় ২৫ মাস কারাগারে ছিলেন রোহিত। দুই মাস আগে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ।

গ্রেফতারের সময় তার কাছ থেকে একটি বাদামি রঙের মানিব্যাগ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ বলছে, মানিব্যাগটি কৈলাশ কুমার নামে এক ব্যক্তির। এতে এটিএম কার্ড, প্যান কার্ড, প্রতিবন্ধী সনদ ও ভোটার পরিচয়পত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া গেছে। এ ছাড়া রোহিতের নিজের আধার কার্ডও উদ্ধার করা হয়েছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

পাটনা সরকারি রেলওয়ে পুলিশের ডিএসপি কাঞ্চন রাজ বলেন, ‘একজন ধূর্ত অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ট্রেন থেকে এক যুবককে ধাক্কা দিয়ে হত্যার ঘটনায় সে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। আগের কয়েকটি মামলাতেও সে পলাতক ছিল। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন।’