Dhaka ১১:০৮ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ৪ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

খুলনায় তানিয়ার পার্লারে দিনে বিউটি পার্লার, রাতে রং মহল

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৮:১৮:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
  • 661

খুলনা প্রতিনিধি: ২০২০ সালে দেশের আলোচিত ঘটনার মধ্যে সাড়া ফেলে পাপিয়াকান্ড। দেশের নামীদামি ব্যাক্তিদেরকে ব্যবহার করে পাপিয়া হয়ে ওঠে এক নারী সম্রাজ্ঞী। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাক্তিদেরকে বশ করে একের পর এক অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে রাজত্ব করেন তিনি। তবে,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় শেকলে বাধা পড়ে পাপিয়া। একে একে বেরিয়ে আসে তার কু-কর্মের চিত্র।
খুলনায় সন্ধান মিলেছে এক নতুন পাপিয়ার। তিনি তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্স এবং খুলনার অভিজাত হোটেল ক্যাসেল সালাম পার্লারের স্বত্বাধিকারী তানিয়া ইসলাম ওরফে তানিয়া শিকদার। একসময়ে ক্যাসেল সালাম পার্লারের একজন সাধারন কর্মচারী হিসেবে কাজ করা তানিয়া এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। মাত্র অল্প দিনের ব্যবধানে এত সম্পদ অর্জন যেন নিতান্তই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার গল্পকে হার মানায়।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায়, তানিয়া বিউটি পার্লারের অভ্যন্তরে চলে অসামাজিক কর্মকান্ড। দিনে রুপসজ্জা ও রুপচর্চা চললেও রাতে চলে অনৈতিক কাজ। রুপচর্চার কাজে নিয়োজিত নারী কর্মচারীদেরকে বাধ্য করা হয় এসকল কাজে। দিনের পার্লার রাতে হয়ে ওঠে রংমহল। তানিয়ার এই রঙ্গমঞ্চে সরকারি ঊচ্চপদস্থ কর্মকর্তা , বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা হাজিরা দেয়।
অনৈতিক কর্মকান্ড ছাড়াও তানিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। সম্প্রতি অনৈতিক কর্মকান্ডসহ নানা অনিয়ম উল্লেখ করে তানিয়ার ৩ জন কর্মচারী সোনাডাঙ্গা থানায় সাধারন ডায়েরি (জিডি)করেন। জিডিতে কর্মীদের বেতন আটকে রাখা, ভেজাল ও নকল প্রসাধনী ব্যবহার ও বিক্রি, নিয়ম বহির্ভূত কর্মকান্ড পরিচালনা, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান , দেহ-ব্যবসা সহ নানা বিষয় উল্লেখ করা হয়।

মিথিলা (ছদ্মনাম) নামক একজন কর্মচারী জিডিতে উল্লেখ করেন , “২০২০ সালে কথিত বিউটিশিয়ান তানিয়ার নিকট রুপচর্চার প্রশিক্ষনের উদ্দেশ্যে যান । কোর্সশেষে বিউটিশিয়ান কোর্স’র সার্টিফিকেট প্রদান করার শর্তে তানিয়া ৭০ হাজার টাকা নেন। ভুক্তভোগীকে পার্লারের কাজের পাশাপাশি শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রয়কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। তবে ৩ বছর অতিক্রম হলেও সার্টিফিকেট না দিয়ে তালবাহানা শুরু করে তানিয়া। এক পর্যায়ে সে অধিক অর্থ ইনকামের লোভ দেখিয়ে দেহ ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয় মিথিলাকে। সার্টিফিকেট প্রদানে অসম্মতিজ্ঞাপন করায় কোর্সের ৭০ হাজার টাকা ও বকেয়া বেতন চায় মিথিলা। একপর্যায়ে টাকা না দিয়ে মিথিলার উপর বিভিন্ন দোষারোপ করে তানিয়া।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী পৃথক জিডি’তে উল্লেখ করেন, ” নিরালা এস ও এস স্কুল সংলগ্ন তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন তিনি। পূর্বে তানিয়ার ক্যাসেল সালামের পার্লারে কাজ করতেন।”
তিনি জিডিতে আরো উল্লেখ করেন, “অতিরিক্ত লাভের আশায় কাস্টমারকে ভেজাল , নকল ও নিন্মমানের প্রসাধনী প্রদান করতেন তানিয়া। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হওয়ায় খুলনা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তর নিরালার পার্লারে অভিযান চালায়। নকল পন্যসহ নানা অনিয়ম পাওয়ায় জরিমানা করে ভ্রাম্যমান আদালত।“
ভুক্তভোগী এ প্রতিবেদককে জানান, অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তানিয়া দোষারোপ করেন এবং কয়েক মাসের বকেয়া বেতন আটকে দেয়। যার কারনে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
তবে নিরালার পার্লারে কর্মরত সুফিয়া সাথী (ছদ্মনাম) নামক কর্মচারী জানান ভিন্নকথা। তিনি জিডিতে উল্লেখ করেন, “সাথী উক্ত শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রয়কর্মী হিসেবে ৮ হাজার টাকা বেতনে যোগদান করেন। বিক্রয়কর্মী হিসেবে যোগদান করলেও তাকে দিয়ে ব্যাক্তিগত ও সাংসারিক কাজ করায় তানিয়া।”
তিনি জিডি’তে আরো উল্লেখ করেন, “তানিয়ার স্বামী ইমরান শিকদার বহুনারীতে আসক্ত ছিলেন। স্বামীর ২য় বৌ থাকায় এবং বাইরের নারীদের সঙ্গ এড়ানোর উদ্দেশ্যে সাথীকে সর্বদা সেজেগুজে থাকতে বলতেন তানিয়া।”
সাথী বলেন, “পার্লারে অনৈতিক কার্যক্রমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চাকরি ছাড়তে হয়। অন্যান্য কর্মীদের মত আমারও ২ মাসের ১৬ হাজার টাকা বেতন বকেয়া রয়েছে। ক’দিন আগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের কারনে আমার টাকা আটকে দিয়েছে।”

শুধু সাথী নয়, স্বামী ইমরানের লোলুপ দৃষ্টির স্বীকার হয়েছেন অনেক নারী। নারীলোভী স্বামীর কথা জেনেও কিছু বলার সাহস পায়না তানিয়া। কারন কিছু বললেই ফাঁস হয়ে যাবে তার কুকর্ম।সম্প্রতি ,তানিয়ার স্বামী ইমরান একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পার্লারের অন্তর্জালের তথ্য ফাস করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়” পার্লার ও শপিং মলের নামে এখানে প্রতিনিয়ত চলে অবৈধ কাজ। পার্লারটি প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় অসামাজিক কর্মের জন্য আসা কাস্টমারদের প্রবেশে সমস্যা হয়না। প্রশাসনও তাদের হাতের নাগালে।“
স্ট্যাটাসে আরো বলা হয়,”এলাকাবাসী কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পারলেও সমস্যা নেই। পারিবারিক সাপোর্টে এসকল কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।” এছাড়া স্ট্যাটাসে আরো উল্লেখ করা হয় ” দিনে পার্লারসহ অন্য ব্যবসা চালালেও, রাতে প্রতিনিয়তই জমজমাট হয় এই অবৈধ ব্যবসা।”
উল্লেখ্য , এসকল কর্মকান্ডের জন্য স্বামীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন তানিয়া।
জানা যায়, উৎসবের দিনে বিশেষ কাপড়ে সারারাত অন্দরমহলে চলে অসামাজিক কর্মকান্ড। নেশাজাত পানীয়সহ নানা আয়োজন থাকে পার্লারে।
এ প্রতিষ্ঠানে কমর্রত এক নারী বলেন, “বিশেষ দিবসে এখানে অনেক আজেবাজে কাজ করা হয়। বাইরের বেশ কয়েকজন ব্যাক্তি এসে নেশাজাত পানীয় পান করে। পার্লারে কর্মরত মেয়েদের কে ছোট কাপড় পরে তৈরী থাকতে বলা হয়।”
শুধু অনৈতিক কর্মকান্ড নয়। তানিয়ার হোটেল ক্যাসেল সালামের পার্লার ও নিরালা মোড়স্থ পার্লারের রূপসজ্জার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন অনেকেই।
নিন্ম মানের প্রসাধনী ও মেয়াদোত্তীর্ন পন্য ব্যবহার করায় অনেকের ত্বকেই দেখা দিয়েছে চর্মসহ নানা রোগ। ত্বকে এসব নকল, ভেজাল ক্রীম ও ঔষধ প্রয়োগের কারনে এলার্জি-জনিত রোগে ভুগছেন অনেকেই।

তারিনা হক নামক এক নারী বলেন, ” দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্রণের সমস্যা । এই পর্যন্ত অনেক টাকা খরচ করেছি এই পার্লারে। ব্রণ কমেনি বরং আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।’’
এছাড়া ত্বক উজ্জল ও মসৃণকারী ক্রীমগুলোর অতিরীক্ত দাম নেওয়া হয় বলে জানান কয়েকজন নারী।

তারা জানান, হাইড্রো ফেশিয়াল , নরমাল ফেশিয়াল, পেডিকিউর , মেনিকিউর, ওয়াক্সিং , পিলিং সহ ত্বকে ব্যবহৃত সকল প্রসাধনীর দাম কয়েকগুন বেশী নেওয়া হয়।
সুমি ইসলাম নামক এক নারী বলেন , “কয়েকদিন ধরে আমি তানিয়া আপার কাছ থেকে বিভিন্ন প্রোডাক্ট নেই। ক’দিন আগে অনলাইনে যাচাই করে দেখলাম তিনি পন্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি দাম নেয়। এসকল বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
এদিকে তানিয়ার নিকট ত্বকের চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী ভুগছেন দীর্ঘদিন ধরে। ত্বকে প্রসাধনী সামগ্রীর ভুল প্রয়োগের কারনে অসুস্থতায় দিন পার করছেন তিনি। শরিরের সংবেদনশীল স্থানে ভুল প্রসাধনী প্রয়োগ করায় ত্বকের বিভিন্ন স্থান ঝলসে গেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমার শরিরের বিভিন্ন স্থানে প্রসাধনী সামগ্রীর ভুল প্রয়োগ করা হয়েছে। যার কারনে আমি ঘর থেকে বের হতে পারিনা। ত্বক পূর্বের ন্যায় করার জন্য চিকিৎসা চলছে।
জানা যায়, কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন না করেই নিজেকে বিউটিশিয়ান দাবি করেন খুলনার অভিজাত পার্লার দুটির মালিক তানিয়া। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সার্টিফিকেট না থাকলেও বিউটি এক্সপার্ট বানানোর দ্বায়িত্ব নেন তিনি। কাজ শিখতে গেলে গুনতে হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কাজ শেখা শেষ হলে সার্টিফিকেট দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন পার্লারটির কথিত বিউটিশিয়ান তানিয়া।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য পার্লার গুলোতে বিভিন্ন সাজ ও রুপচর্চার ক্যাটালগ কিংবা মুল্য নির্ধারন কার্ড থাকে। তবে এখানে কোনো ধরনের ক্যাটালগ না থাকায় বিভ্রান্তিতে পড়েন ভোক্তারা।
ভোক্তাশ্রেনীর অভিযোগের ভিত্তিতে কিছুদিন পূর্বে তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অভিযানটি পরিচালনা করেন খুলনার উপ-পরিচালক দিলারা জামান। এসময় বিপুল পরিমানে ভেজাল , নকল, মেয়াদোত্তীর্ন পন্য পাওয়ায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এসময় বিউটিশিয়ান হিসেবে কোনো সার্টিফিকেট দেখাতে পারেন নি পার্লারটির মালিক তানিয়া।
এসকল বিষয়ে তানিয়ার নিকট জানতে চাইলে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেন।
পার্লারের অন্তরালে অনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন,”কিছু মানুষ আমার ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এসকল তথ্য সব ভিত্তিহীন।”
এছাড়া ত্বকের সমস্যায় ভোগা বিভিন্ন নারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গায়ের রং কালো থেকে উজ্জল করতে হলে এধরনের সমস্যা একটু হয়। আমি আমার কাস্টমারদেরকে জানিয়েই মেডিসিন প্রয়োগ করি।“
এসকল বিষয়ে সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মমতাজুল হক বলেন, “তানিয়ার বিরুদ্ধে তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। প্রসিকিউশনের জন্য জিডির কপি আদালতে প্রেরন করা হয়েছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী সার্বিক বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।”
এসকল পাপিয়াখ্যাত তানিয়ার মত অনেক তানিয়া লুকিয়ে আছে শহরের আনাছে-কানাচে। আভিজাত্যের চাদর মুড়ে সমাজের উচ্চ শ্রেনীর মানুষের সাথে ওঠাবসা করায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে তারা। সঠিক পন্থায় এই সকল পাপিয়াদেরকে আইনের আওতায় আনলেই সমাজব্যবস্থা সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা।

 

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয়

খুলনায় তানিয়ার পার্লারে দিনে বিউটি পার্লার, রাতে রং মহল

Update Time : ০৮:১৮:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

খুলনা প্রতিনিধি: ২০২০ সালে দেশের আলোচিত ঘটনার মধ্যে সাড়া ফেলে পাপিয়াকান্ড। দেশের নামীদামি ব্যাক্তিদেরকে ব্যবহার করে পাপিয়া হয়ে ওঠে এক নারী সম্রাজ্ঞী। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যাক্তিদেরকে বশ করে একের পর এক অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে রাজত্ব করেন তিনি। তবে,আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় শেকলে বাধা পড়ে পাপিয়া। একে একে বেরিয়ে আসে তার কু-কর্মের চিত্র।
খুলনায় সন্ধান মিলেছে এক নতুন পাপিয়ার। তিনি তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্স এবং খুলনার অভিজাত হোটেল ক্যাসেল সালাম পার্লারের স্বত্বাধিকারী তানিয়া ইসলাম ওরফে তানিয়া শিকদার। একসময়ে ক্যাসেল সালাম পার্লারের একজন সাধারন কর্মচারী হিসেবে কাজ করা তানিয়া এখন কয়েক কোটি টাকার মালিক। মাত্র অল্প দিনের ব্যবধানে এত সম্পদ অর্জন যেন নিতান্তই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার গল্পকে হার মানায়।
দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায়, তানিয়া বিউটি পার্লারের অভ্যন্তরে চলে অসামাজিক কর্মকান্ড। দিনে রুপসজ্জা ও রুপচর্চা চললেও রাতে চলে অনৈতিক কাজ। রুপচর্চার কাজে নিয়োজিত নারী কর্মচারীদেরকে বাধ্য করা হয় এসকল কাজে। দিনের পার্লার রাতে হয়ে ওঠে রংমহল। তানিয়ার এই রঙ্গমঞ্চে সরকারি ঊচ্চপদস্থ কর্মকর্তা , বড় ব্যবসায়ী, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দসহ প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা হাজিরা দেয়।
অনৈতিক কর্মকান্ড ছাড়াও তানিয়ার বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ। সম্প্রতি অনৈতিক কর্মকান্ডসহ নানা অনিয়ম উল্লেখ করে তানিয়ার ৩ জন কর্মচারী সোনাডাঙ্গা থানায় সাধারন ডায়েরি (জিডি)করেন। জিডিতে কর্মীদের বেতন আটকে রাখা, ভেজাল ও নকল প্রসাধনী ব্যবহার ও বিক্রি, নিয়ম বহির্ভূত কর্মকান্ড পরিচালনা, ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদান , দেহ-ব্যবসা সহ নানা বিষয় উল্লেখ করা হয়।

মিথিলা (ছদ্মনাম) নামক একজন কর্মচারী জিডিতে উল্লেখ করেন , “২০২০ সালে কথিত বিউটিশিয়ান তানিয়ার নিকট রুপচর্চার প্রশিক্ষনের উদ্দেশ্যে যান । কোর্সশেষে বিউটিশিয়ান কোর্স’র সার্টিফিকেট প্রদান করার শর্তে তানিয়া ৭০ হাজার টাকা নেন। ভুক্তভোগীকে পার্লারের কাজের পাশাপাশি শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রয়কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেন তিনি। তবে ৩ বছর অতিক্রম হলেও সার্টিফিকেট না দিয়ে তালবাহানা শুরু করে তানিয়া। এক পর্যায়ে সে অধিক অর্থ ইনকামের লোভ দেখিয়ে দেহ ব্যবসায়ে সম্পৃক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয় মিথিলাকে। সার্টিফিকেট প্রদানে অসম্মতিজ্ঞাপন করায় কোর্সের ৭০ হাজার টাকা ও বকেয়া বেতন চায় মিথিলা। একপর্যায়ে টাকা না দিয়ে মিথিলার উপর বিভিন্ন দোষারোপ করে তানিয়া।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক ভুক্তভোগী পৃথক জিডি’তে উল্লেখ করেন, ” নিরালা এস ও এস স্কুল সংলগ্ন তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্সে কর্মরত ছিলেন তিনি। পূর্বে তানিয়ার ক্যাসেল সালামের পার্লারে কাজ করতেন।”
তিনি জিডিতে আরো উল্লেখ করেন, “অতিরিক্ত লাভের আশায় কাস্টমারকে ভেজাল , নকল ও নিন্মমানের প্রসাধনী প্রদান করতেন তানিয়া। বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা সৃষ্টি হওয়ায় খুলনা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষন অধিদপ্তর নিরালার পার্লারে অভিযান চালায়। নকল পন্যসহ নানা অনিয়ম পাওয়ায় জরিমানা করে ভ্রাম্যমান আদালত।“
ভুক্তভোগী এ প্রতিবেদককে জানান, অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তানিয়া দোষারোপ করেন এবং কয়েক মাসের বকেয়া বেতন আটকে দেয়। যার কারনে বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি।
তবে নিরালার পার্লারে কর্মরত সুফিয়া সাথী (ছদ্মনাম) নামক কর্মচারী জানান ভিন্নকথা। তিনি জিডিতে উল্লেখ করেন, “সাথী উক্ত শপিং কমপ্লেক্সে বিক্রয়কর্মী হিসেবে ৮ হাজার টাকা বেতনে যোগদান করেন। বিক্রয়কর্মী হিসেবে যোগদান করলেও তাকে দিয়ে ব্যাক্তিগত ও সাংসারিক কাজ করায় তানিয়া।”
তিনি জিডি’তে আরো উল্লেখ করেন, “তানিয়ার স্বামী ইমরান শিকদার বহুনারীতে আসক্ত ছিলেন। স্বামীর ২য় বৌ থাকায় এবং বাইরের নারীদের সঙ্গ এড়ানোর উদ্দেশ্যে সাথীকে সর্বদা সেজেগুজে থাকতে বলতেন তানিয়া।”
সাথী বলেন, “পার্লারে অনৈতিক কার্যক্রমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চাকরি ছাড়তে হয়। অন্যান্য কর্মীদের মত আমারও ২ মাসের ১৬ হাজার টাকা বেতন বকেয়া রয়েছে। ক’দিন আগে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানের কারনে আমার টাকা আটকে দিয়েছে।”

শুধু সাথী নয়, স্বামী ইমরানের লোলুপ দৃষ্টির স্বীকার হয়েছেন অনেক নারী। নারীলোভী স্বামীর কথা জেনেও কিছু বলার সাহস পায়না তানিয়া। কারন কিছু বললেই ফাঁস হয়ে যাবে তার কুকর্ম।সম্প্রতি ,তানিয়ার স্বামী ইমরান একটি স্ট্যাটাসের মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পার্লারের অন্তর্জালের তথ্য ফাস করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়” পার্লার ও শপিং মলের নামে এখানে প্রতিনিয়ত চলে অবৈধ কাজ। পার্লারটি প্রধান সড়কের পাশে হওয়ায় অসামাজিক কর্মের জন্য আসা কাস্টমারদের প্রবেশে সমস্যা হয়না। প্রশাসনও তাদের হাতের নাগালে।“
স্ট্যাটাসে আরো বলা হয়,”এলাকাবাসী কিংবা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী জানতে পারলেও সমস্যা নেই। পারিবারিক সাপোর্টে এসকল কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।” এছাড়া স্ট্যাটাসে আরো উল্লেখ করা হয় ” দিনে পার্লারসহ অন্য ব্যবসা চালালেও, রাতে প্রতিনিয়তই জমজমাট হয় এই অবৈধ ব্যবসা।”
উল্লেখ্য , এসকল কর্মকান্ডের জন্য স্বামীর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেন তানিয়া।
জানা যায়, উৎসবের দিনে বিশেষ কাপড়ে সারারাত অন্দরমহলে চলে অসামাজিক কর্মকান্ড। নেশাজাত পানীয়সহ নানা আয়োজন থাকে পার্লারে।
এ প্রতিষ্ঠানে কমর্রত এক নারী বলেন, “বিশেষ দিবসে এখানে অনেক আজেবাজে কাজ করা হয়। বাইরের বেশ কয়েকজন ব্যাক্তি এসে নেশাজাত পানীয় পান করে। পার্লারে কর্মরত মেয়েদের কে ছোট কাপড় পরে তৈরী থাকতে বলা হয়।”
শুধু অনৈতিক কর্মকান্ড নয়। তানিয়ার হোটেল ক্যাসেল সালামের পার্লার ও নিরালা মোড়স্থ পার্লারের রূপসজ্জার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন অনেকেই।
নিন্ম মানের প্রসাধনী ও মেয়াদোত্তীর্ন পন্য ব্যবহার করায় অনেকের ত্বকেই দেখা দিয়েছে চর্মসহ নানা রোগ। ত্বকে এসব নকল, ভেজাল ক্রীম ও ঔষধ প্রয়োগের কারনে এলার্জি-জনিত রোগে ভুগছেন অনেকেই।

তারিনা হক নামক এক নারী বলেন, ” দীর্ঘদিন ধরে আমার ব্রণের সমস্যা । এই পর্যন্ত অনেক টাকা খরচ করেছি এই পার্লারে। ব্রণ কমেনি বরং আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে।’’
এছাড়া ত্বক উজ্জল ও মসৃণকারী ক্রীমগুলোর অতিরীক্ত দাম নেওয়া হয় বলে জানান কয়েকজন নারী।

তারা জানান, হাইড্রো ফেশিয়াল , নরমাল ফেশিয়াল, পেডিকিউর , মেনিকিউর, ওয়াক্সিং , পিলিং সহ ত্বকে ব্যবহৃত সকল প্রসাধনীর দাম কয়েকগুন বেশী নেওয়া হয়।
সুমি ইসলাম নামক এক নারী বলেন , “কয়েকদিন ধরে আমি তানিয়া আপার কাছ থেকে বিভিন্ন প্রোডাক্ট নেই। ক’দিন আগে অনলাইনে যাচাই করে দেখলাম তিনি পন্যের দাম দ্বিগুণেরও বেশি দাম নেয়। এসকল বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।”
এদিকে তানিয়ার নিকট ত্বকের চিকিৎসা নিতে আসা এক নারী ভুগছেন দীর্ঘদিন ধরে। ত্বকে প্রসাধনী সামগ্রীর ভুল প্রয়োগের কারনে অসুস্থতায় দিন পার করছেন তিনি। শরিরের সংবেদনশীল স্থানে ভুল প্রসাধনী প্রয়োগ করায় ত্বকের বিভিন্ন স্থান ঝলসে গেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমার শরিরের বিভিন্ন স্থানে প্রসাধনী সামগ্রীর ভুল প্রয়োগ করা হয়েছে। যার কারনে আমি ঘর থেকে বের হতে পারিনা। ত্বক পূর্বের ন্যায় করার জন্য চিকিৎসা চলছে।
জানা যায়, কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার্জন না করেই নিজেকে বিউটিশিয়ান দাবি করেন খুলনার অভিজাত পার্লার দুটির মালিক তানিয়া। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো সার্টিফিকেট না থাকলেও বিউটি এক্সপার্ট বানানোর দ্বায়িত্ব নেন তিনি। কাজ শিখতে গেলে গুনতে হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। কাজ শেখা শেষ হলে সার্টিফিকেট দেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন পার্লারটির কথিত বিউটিশিয়ান তানিয়া।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অন্যান্য পার্লার গুলোতে বিভিন্ন সাজ ও রুপচর্চার ক্যাটালগ কিংবা মুল্য নির্ধারন কার্ড থাকে। তবে এখানে কোনো ধরনের ক্যাটালগ না থাকায় বিভ্রান্তিতে পড়েন ভোক্তারা।
ভোক্তাশ্রেনীর অভিযোগের ভিত্তিতে কিছুদিন পূর্বে তানিয়া বিউটি পার্লার এন্ড শপিং কমপ্লেক্সে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। অভিযানটি পরিচালনা করেন খুলনার উপ-পরিচালক দিলারা জামান। এসময় বিপুল পরিমানে ভেজাল , নকল, মেয়াদোত্তীর্ন পন্য পাওয়ায় ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এসময় বিউটিশিয়ান হিসেবে কোনো সার্টিফিকেট দেখাতে পারেন নি পার্লারটির মালিক তানিয়া।
এসকল বিষয়ে তানিয়ার নিকট জানতে চাইলে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে আখ্যায়িত করেন।
পার্লারের অন্তরালে অনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার ব্যপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন,”কিছু মানুষ আমার ক্ষতি করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। এসকল তথ্য সব ভিত্তিহীন।”
এছাড়া ত্বকের সমস্যায় ভোগা বিভিন্ন নারীদের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গায়ের রং কালো থেকে উজ্জল করতে হলে এধরনের সমস্যা একটু হয়। আমি আমার কাস্টমারদেরকে জানিয়েই মেডিসিন প্রয়োগ করি।“
এসকল বিষয়ে সোনাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মমতাজুল হক বলেন, “তানিয়ার বিরুদ্ধে তিনটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হয়েছে। প্রসিকিউশনের জন্য জিডির কপি আদালতে প্রেরন করা হয়েছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী সার্বিক বিষয়ে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।”
এসকল পাপিয়াখ্যাত তানিয়ার মত অনেক তানিয়া লুকিয়ে আছে শহরের আনাছে-কানাচে। আভিজাত্যের চাদর মুড়ে সমাজের উচ্চ শ্রেনীর মানুষের সাথে ওঠাবসা করায় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে তারা। সঠিক পন্থায় এই সকল পাপিয়াদেরকে আইনের আওতায় আনলেই সমাজব্যবস্থা সুস্থ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশ্লেষকেরা।