রাজনীতির নক্ষত্রপতন : না ফেরার দেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:৩৭:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫
  • 422

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আজ এক গভীর শোকের দিন। সব জল্পনা-কল্পনা ও দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি দলটির বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মেও তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়। বেগম জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ নানা জটিল শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর গভীর রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ও কোটি মানুষের দোয়ার মাঝেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
একসময়ের লাজুক গৃহবধূ থেকে সময়ের প্রয়োজনে তিনি হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আপোষহীন নেত্রী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের হাল ধরা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া, এক-এগারোর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে অবিচল থাকা—তার জীবন ছিল ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অনন্য মহাকাব্য।
১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুল রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন ১৯৮১ সালের ৩০ মে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর। বিএনপি যখন ভাঙনের মুখে, তখনই তিনি রাজপথে নামেন। ১৯৮৩ সালে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক উত্থান।
জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনে তার ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
তার শাসনামলে শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ ও অর্থনৈতিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধিত হয়। মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, যমুনা সেতু, মোবাইল ফোন উন্মুক্তকরণসহ বহু যুগান্তকারী উদ্যোগ তার সরকারের সময়েই বাস্তবায়িত হয়।
২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের কারাবাস—দীর্ঘ সময় তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। কারাগারে ও গৃহবন্দিত্বে থেকেও তিনি নীতিগত আপোষ করেননি। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না পেলেও দেশের মাটি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পতনের পর তিনি নিঃশর্ত মুক্তি পান। মুক্তির পর প্রতিশোধ নয়, বরং শান্তি ও সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়ে তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত উদারতার নজির স্থাপন করেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। ফোর্বস, টাইম ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সংগ্রাম, আদর্শ ও ত্যাগ ইতিহাসে অম্লান থাকবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক ধ্রুবতারা—যার আলো কখনো নিভবে না।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Din Mohammad

বাণিজ্য মেলার প্রধান ফটক ভেঙে ক্যাম্পাসে ফিরলেন শেকৃবি শিক্ষার্থীরা

রাজনীতির নক্ষত্রপতন : না ফেরার দেশে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া

Update Time : ১১:৩৭:২২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫

বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আজ এক গভীর শোকের দিন। সব জল্পনা-কল্পনা ও দীর্ঘ লড়াইয়ের অবসান ঘটিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পাশাপাশি দলটির বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মেও তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করা হয়। বেগম জিয়ার প্রয়াণে বাংলাদেশের রাজনীতির এক দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো।
দীর্ঘদিন ধরে তিনি লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগসহ নানা জটিল শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর গভীর রাতে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা ও কোটি মানুষের দোয়ার মাঝেই তিনি চিরবিদায় নিলেন।
একসময়ের লাজুক গৃহবধূ থেকে সময়ের প্রয়োজনে তিনি হয়ে ওঠেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের আপোষহীন নেত্রী। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলের হাল ধরা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া, এক-এগারোর ষড়যন্ত্র মোকাবিলা এবং দীর্ঘ ১৬ বছরের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে অবিচল থাকা—তার জীবন ছিল ত্যাগ ও সংগ্রামের এক অনন্য মহাকাব্য।
১৯৪৫ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম পুতুল রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন ১৯৮১ সালের ৩০ মে স্বামী জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর। বিএনপি যখন ভাঙনের মুখে, তখনই তিনি রাজপথে নামেন। ১৯৮৩ সালে দলের নেতৃত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার রাজনৈতিক উত্থান।
জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আপোষহীন অবস্থান তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে দেয়। ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার পতনে তার ভূমিকা ছিল নির্ণায়ক। ১৯৯১ সালে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
তার শাসনামলে শিক্ষা, নারী ক্ষমতায়ন, অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ ও অর্থনৈতিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধিত হয়। মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, যমুনা সেতু, মোবাইল ফোন উন্মুক্তকরণসহ বহু যুগান্তকারী উদ্যোগ তার সরকারের সময়েই বাস্তবায়িত হয়।
২০০৭ সালের জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে ২০১৮ সালের কারাবাস—দীর্ঘ সময় তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হন। কারাগারে ও গৃহবন্দিত্বে থেকেও তিনি নীতিগত আপোষ করেননি। চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার সুযোগ না পেলেও দেশের মাটি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার পতনের পর তিনি নিঃশর্ত মুক্তি পান। মুক্তির পর প্রতিশোধ নয়, বরং শান্তি ও সহাবস্থানের আহ্বান জানিয়ে তিনি রাষ্ট্রনায়কোচিত উদারতার নজির স্থাপন করেন।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও তিনি ছিলেন সমাদৃত। ফোর্বস, টাইম ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আজ তিনি নেই, কিন্তু তার সংগ্রাম, আদর্শ ও ত্যাগ ইতিহাসে অম্লান থাকবে। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে বেগম খালেদা জিয়া এক ধ্রুবতারা—যার আলো কখনো নিভবে না।