আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগ ও স্থায়ী হওয়া একাধিক প্রকৌশলী-কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে এখনো খুলনা ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের দায়িত্ব পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অর্থ ব্যয় নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা সময়ে খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ ও বোতলজাত পানি সরবরাহের মতো বড় বাজেটের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পায়নি খুলনাবাসী। পাশাপাশি ২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ডিও লেটারের মাধ্যমে চাকরি স্থায়ীকরণ পাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অংশ এখনো ওয়াসার গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সূত্রমতে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুপারিশে চাকরি পাওয়া খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ এখনো কর্মরত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি ‘খুলনা আধুনিক ও টেকসই পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের’ প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি পানি সরবরাহ প্রকল্প-২-এর ছায়া প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। সূত্রের দাবি, পানি সরবরাহ প্রকল্পে প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ইউনিট (PMU) গঠনের আগেই আর্থিক সুবিধা নিয়ে টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে খান সেলিম আহমেদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২,৫৫৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প
খুলনা মহানগরীতে বসবাসকারী প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জন্য পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও গণমুখী পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা)-এর আর্থিক সহযোগিতায় খুলনা ওয়াসার আওতায় ‘খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়।
২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা।
সূত্রের দাবি, প্রকল্পটির জন্য ২০১১ সালে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ১৮ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রকল্প পরিচালকের পদের জন্য ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা ও সর্বোচ্চ ৫২ বছর বয়স, প্রকল্প ব্যবস্থাপকের জন্য ১২ বছরের অভিজ্ঞতা ও সর্বোচ্চ ৪৬ বছর বয়স এবং নির্বাহী প্রকৌশলী পদের জন্য সাত বছরের অভিজ্ঞতা ও সর্বোচ্চ ৪০ বছর বয়স নির্ধারণ করা হয়েছিল।
প্রকল্পটির পরিচালক ছিলেন মো. কামাল হোসেন। তিনি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর খুলনা ওয়াসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন।
তবে প্রকল্পে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজনের সংশ্লিষ্ট কাজে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ছিল না বলে দাবি করেছে ওয়াসার একাধিক সূত্র। তাদের অভিযোগ, খুলনার একটি প্রভাবশালী পরিবারের সুপারিশে কয়েকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
৭৫ হাজার বাড়ির বদলে কত সংযোগ?
প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য ছিল খুলনা মহানগরীর ৭৫ হাজার বাড়িতে পানি সংযোগ দেওয়া। কিন্তু একাধিকবার সময় বাড়ানোর পর ২০১৯ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়।
সূত্রের দাবি, প্রকল্প শেষে প্রায় ৩৮ হাজার বাড়িতে সংযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে ওয়াসার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পরবর্তীতে লক্ষ্যমাত্রা ৭৫ হাজার থেকে কমিয়ে ৪০ হাজার করা হয়েছিল।
এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে—লক্ষ্যমাত্রা কমানো হলে অব্যবহৃত অর্থের কী হয়েছে এবং প্রকল্পের আর্থিক হিসাব কীভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে?
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের আওতায় মিটার সংযোগও দেওয়া হয়নি। পরবর্তীতে খুলনা ওয়াসার নিজস্ব অর্থে মিটার সংযোগ দিতে গিয়ে প্রায় ৭৭ লাখ ৫২ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি উপ-সহকারীদের বিল বাবদ এক কোটি টাকার বেশি অর্থ এখনো বকেয়া রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।
প্রকল্প শেষ, কর্মকর্তাদের স্থায়ীকরণ নিয়ে প্রশ্ন
পানি সরবরাহ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেখানে কর্মরতদের খুলনা ওয়াসায় স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ জন্য ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট নতুন করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৪৫ বছর এবং নির্বাহী প্রকৌশলী পদের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৪০ বছর নির্ধারণ করা হয়।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির প্রায় নয় বছর পর বয়সসীমা নিয়ে নতুন করে শর্ত নির্ধারণ করায় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
‘আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য’ উল্লেখ করে চিঠি
২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর তৎকালীন প্রাণিসম্পদমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্পের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের নিয়োগের বিষয়ে একটি চিঠি দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই চিঠিতে নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালের পর প্রকল্পের জনবল রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের বিষয়টি ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সুপারিশ ছিল না। ফলে প্রকল্পের জনবলকে রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্ত করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি চাওয়া হয় এবং এ সংক্রান্ত নথিতে তিনি স্বাক্ষর করেন বলে সূত্র জানায়।
তবে পরবর্তীতে ওই সিদ্ধান্ত সংশোধন করা হয়েছিল বলে দাবি করেছেন খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ।
পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্প নিয়েও অভিযোগ
এদিকে বর্তমানে খান সেলিম আহমেদ খুলনা আধুনিক ও টেকসই পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়েও নানা অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রকল্পটি অনুমোদিত পরিকল্পনা অনুযায়ী বাস্তবায়নের পরিবর্তে বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাচারিতার মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও প্রকল্পের আর্থিক হিসাব পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, প্রকল্পগুলোতে দায়িত্ব পালনকালে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো তদন্ত হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























