জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুলের কণ্ঠ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে নকল করে প্লাটিনাম জুট মিলের পুরাতন যন্ত্রাংশ বিক্রির কথা বলে খুলনার এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে আটক করেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। আটক আসামিএ এজাজ আহমেদ রাজা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এ পর্যন্ত ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মামলার বাদী খুলনার ব্যবসায়ী জিএম আজিজুর রহমান। এজাহার সূত্রে জানা গেছে, তার বড় ভাই জিএম মফিজুর রহমান টিকু যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী। তাকে খুলনা মহানগর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আরিফ জানান, জাতীয় সংসদের হুইপ ‘বকুল ভাই’ তার সঙ্গে কথা বলতে চান। পরে +১ (৯২৯) ২২৩-৩৪২৭ নম্বরটি ‘বকুল সাহেবের নম্বর’ হিসেবে দেওয়া হয়।
ওই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপে কল করলে অপর প্রান্তের ব্যক্তি নিজেকে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল পরিচয় দিয়ে কথা বলেন। ২৯ জুলাই রাত ২টা ৩৮ মিনিটে ব্যবসায়ী পশ্চিম টুটপাড়ার বাসায় অবস্থানকালে তার বড় ভাই তাকে ওই ব্যক্তির সঙ্গে গ্রুপ কলে যুক্ত করেন। সেখানে প্লাটিনাম জুট মিলের পুরাতন যন্ত্রাংশ কেনাবেচা নিয়ে আলোচনা হয়।
আলোচনার একপর্যায়ে হুইপের পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি যন্ত্রাংশ কেনার আগে অগ্রিম পেমেন্ট করার কথা বলেন। সকালে টাকা দিতে পারবেন কি না জানতে চাইলে ব্যবসায়ী সম্মতি জানান। পরে একজন প্রতিনিধি তার সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানানো হয়।
এজাহারে বলা হয়েছে, ২৯ জুলাই বিকেল সোয়া ৩টা থেকে সাড়ে ৪টার মধ্যে মাহাবুবুর রহমান মামুনের আসার কথা থাকলেও তিনি নিজে না এসে এজাজ আহমেদ রাজাসহ আরও একজনকে ব্যবসায়ীর অফিসে পাঠান। সেখানে পুরাতন যন্ত্রাংশ কেনার পেমেন্ট বাবদ এজাজ আহমেদ রাজাকে ২ কোটি টাকা দেওয়া হয়।
এরপর আবারও ওই নম্বর থেকে ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এবার তাকে হার্ডবোর্ড মিল কেনার প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্যবসায়ী জানান, এত টাকা তাৎক্ষণিকভাবে জোগাড় করা সম্ভব নয় এবং মিলটি আগে দেখতে হবে।
পরবর্তীতে আইনজীবী মোহাম্মদ আলী বাবু ৩০ জুলাই ভোররাতে হোয়াটসঅ্যাপে ব্যবসায়ীকে জানান, ‘বকুল ভাই’ তাকে জুট মিলে যেতে বলেছেন। এর ধারাবাহিকতায় ব্যবসায়ী জুট মিলে যান। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পরবর্তীতে এজাজ আহমেদ রাজা ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আরও দেড় কোটি টাকা দেওয়া হয়।
তবে মামলার আরেকটি সূত্রে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় দফার দেড় কোটি টাকা ২ আগস্ট খুলনা সদর থানাধীন স্যার ইকবাল রোডের আলফি ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কার্যালয়ে দেওয়া হয়। দুই দফায় মোট ৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা হস্তান্তর করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
টাকা দেওয়ার পর অভিযুক্তরা বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। পরে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল খুলনায় এলে ব্যবসায়ী সরাসরি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় হুইপ জানান, তিনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না এবং এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এরপর ব্যবসায়ী প্রতারণার শিকার হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেন।
এ ঘটনায় ১৮ সেপ্টেম্বর খুলনা সদর থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করেন জিএম আজিজুর রহমান। মামলায় এজাজ আহমেদ রাজাকে ১ নম্বর এবং শেখ মাহাবুবুর রহমান মামুনকে ২ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও ৫-৬ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির কথা উল্লেখ রয়েছে।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআই ব্যবহার করে হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুলের কণ্ঠস্বর নকল করে তার পরিচয়ে কথা বলেন। পরে সাইবার স্পেস ব্যবহার করে বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণারর মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
মামলাটি পরে মহানগর গোয়েন্দা শাখায় হস্তান্তর করা হয়। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির এসআই সাইদুর রহমান বলেন, মামলার প্রধান আসামি এজাজ আহমেদ রাজাসহ এ পর্যন্ত চারজনকে আটক করা হয়েছে। রোববার রাতে বয়রা রায়েরমহল এলাকা থেকে জাকিয়া সুলতানা নামে এক নারীকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। আটক ব্যক্তিরা মামলার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।
এদিকে, এ ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে খুলনা মহানগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ইমরান ও তার গাড়িচালক বাবুকেও আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে তাদের জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে বলেও ওই সূত্রের দাবি।
২৬ সেপ্টেম্বর ভোরে পটুয়াখালী থেকে যুবদল নেতা সুমনকে ডিবির একটি দল আটক করে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে বলে সূত্রটি জানায়। তবে তদন্তাধীন থাকায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ বিস্তারিত জানায়নি।
কেএমপির গোয়েন্দা শাখার উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা সম্ভব হচ্ছে না। তদন্ত শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















