প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ অর্জন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে যেসব সাহসী মানুষ দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদানকে সম্মান জানাতে চাইলে আমাদেরকে একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গড়ে তুলতে হবে।’
আজ রোববার সকালে বাংলাদেশ চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ‘কর্মমুখী ও টেকনিক্যাল শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ’ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণ শুধুমাত্র দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি কিংবা দেশের সাংবিধানিক এবং বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকেই অকার্যকর করে দেয়নি, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকেও বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে নিজেদেরকে প্রস্তুত রাখতে না পারলে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়বে।’
তিনি বলেন, দেশে আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে গুরুত্ত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ সারাদেশে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এসব প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে ৪০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। ইতোমধ্যে এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার সমস্যা, সঙ্কট ও প্রতিবন্ধকতা নিরসন এবং শহর কিংবা গ্রামের যারা উচ্চশিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী তাদের জন্য সুযোগ নিশ্চিত করতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তারেক রহমান বলেন, বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অবাধ প্রসার ও ব্যবহার বর্তমানে মানুষের জন্য নানামুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। অটোমেশন এবং এআই-চালিত প্রযুক্তির কারণে
অনেক পুরোনো পেশায় কর্মসংস্থান যেমন ঝুঁকির মুখে পড়েছে কিংবা অবলুপ্ত হয়েছে। একইসাথে প্রচুর পরিমান নতুন নতুন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং প্রযুক্তিগত বিপ্লব মোকাবেলায় সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে বর্তমানে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তি-নির্ভর এবং বাস্তব ও কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকার অগ্রাধিকারভিত্তিতে প্রাথমিক পর্যায় থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষা কারিকুলামকে বাস্তবভিত্তিক, কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ ইতোমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে। গবেষণা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই সময়ে শিক্ষা কারিকুলামের পরিমার্জন এবং সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটি আশার কথা, বাস্তবতা উপলব্ধি করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষও ইতোমধ্যেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে সময়োপযোগী, আধুনিক এবং বাস্তবমুখী করার কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আজকের এই অনুষ্ঠান তারই বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে করি।
তিনি বলেন, শিক্ষা শুধু ব্যক্তির পরিবর্তনের জন্যই নয়, বরং বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন
এবং বিশ্বমানের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা তৈরিরও প্রধান নিয়ামক। ফলে উচ্চ শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো প্রযুক্তি নির্ভর এবং কর্মমুখী করতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া লিঙ্কেজ বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের দাবি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই চলমান সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। তবে আমাদের এটিও মনে রাখা প্রয়োজন, একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই। আমি আশা করি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ শিক্ষাব্যবস্থায় প্রযুক্তি নির্ভরতা, দক্ষতা এবং মর্ডানাইজেশনের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি ও পরিবেশ সংরক্ষণ- এসব বিষয়গুলোর প্রতি আরো অধিক গুরুত্ব দেবেন, যত্নশীল থাকবেন।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী বের হয়। উচ্চশিক্ষা নিয়েও শিক্ষিত শিক্ষার্থীদের অনেককে বেকার থাকতে হয়। এর কারণ হিসেবে অনেকেই মনে করেন, সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক সার্টিফিকেট অর্জন করলেও ব্যবহারিক, প্রায়োগিক কিংবা প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে না পারাই শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি হওয়ার অন্যতম কারণ। সুতরাং পরিস্থিতি বিবেচনা করে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার এপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং ইন্ড্রাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া সহযোগিতা বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে চায়।
তিনি আরো বলেন, প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে এই পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীগণ অ্যাকাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষার্থী অবস্থাতেই কর্মদক্ষতা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। ফলে শিক্ষা জীবন শেষে তাকে আর বেকার থাকতে হবে না।
তারেক রহমান বলেন, এছাড়াও সরকার ক্যাম্পাস থেকেই ব্যবসায়িক উদ্যোক্তা তৈরি করারও বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই অংশ হিসেবে সরকার কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ইনোভেটিভ বিজনেস আইডিয়া’ বাণিজ্যিকীকরণ করতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা ‘ইনোভেশন গ্র্যান্ট’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার আশা করে এর ফলে অনেক আগ্রহী তরুণ উদ্যোক্তা নতুন এবং সৃজনশীল ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সক্ষম হবেন। শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় বাস্তব কর্মদক্ষতা অর্জনের ফলে একজন শিক্ষার্থী চাকরির জন্য অপেক্ষা না করে এমন হতে পারে নিজেই একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আরো কয়েকজনের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।
তিনি বলেন, শিক্ষকের জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও অঙ্গীকারের ওপর শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য অনেকটাই নির্ভর করে। এ জন্য শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ পাঠদানের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সামনে একজন রোল মডেল হয়ে উঠবেন, একইসাথে হবেন সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত এবং পথপ্রদর্শক, আমরা সবাই শিক্ষকদের কাছে এমনটাই আশা করে। দেশের তারুণ্য এবং ছাত্র যুবশক্তিকে যদি প্রযুক্তিতে-জ্ঞানে-বিজ্ঞানে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয় সমৃদ্ধ স্বনির্ভর বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে বিশ্বের রোল মডেল। দেশের তরুণ সম্প্রদায়ের প্রতি আমার আহ্বান, নিজেদেরকে যথাযোগ্যভাবে গড়ে তুলতে পারলে তোমরাই হবে আগামী দিনের সমৃদ্ধ স্বনির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশের নির্মাতা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের তরুণ সমাজের প্রতি আহ্বান, প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি দেশের আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক নৈতিক মূল্যবোধে নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করতে হবে। আমি বিশ্বাস করি, বাংলা এবং ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ভাষা শিখতে পারলে দেশে বিদেশে কোথাও চাকরির অভাব হবে না। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এই সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ গড়তে চায়।জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি হলো এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, মেধা, যোগ্যতা এবং সৃজনশীলতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি আক্রমন করে বলতে চাই, জাতীয় উন্নয়ন কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। এটি একটি সম্মিলিত যাত্রা। এই যাত্রায় বর্তমান সরকার বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর সকলের সহযোগিতা আশা করে। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমরা যদি ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি, তাহলে আমাদের অগ্রযাত্রা কেউ রুদ্ধ করতে পারবে না। ইনশাআল্লাহ।
তিনি বলেন, সবাই মিলে এমন একটি কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলি যা শুধু সনদ প্রদান করবে না, বরং দেশে দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করবে। জনসংখ্যাকে জন সম্পদে রূপান্তর করবে। শিক্ষা শুধু চাকরিজীবী তৈরি করবে না বরং নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করবে। শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক রূপান্তরেরও ভিত্তি নির্মাণ করবে।
শুধু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নয়, জাতীয় সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ডেস্ক নিউজ 

















