এক মাস আগে টাঙ্গাইল থেকে ঢাকায় এসে পূর্ব শেওড়াপাড়ার একটি মেসে থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির লক্ষ্যে প্রস্তুতিতে থাকা মো. রাকিবুল ইসলাম (১৭)। ফেসবুকের মাধ্যমে পূর্বপরিচিত আবদুল্লাহ আল মামুনের ফোন পেয়ে গত ১৬ সেপ্টেম্বর শেওড়াপাড়া মেট্রোরেল স্টেশনের সামনে যাওয়ার পর আর ফেরেনি রাকিব।
রাকিবের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তার বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ঢাকায় এসে কাফরুল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। সেই জিডির সূত্র ধরে তদন্ত শুরু করে পুলিশ। পরে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরের সূত্রে আবদুল্লাহ আল মামুন ওরফে মামুন সরকারকে গ্রেফতার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নীলফামারীর ডিমলার একটি সুপারিবাগান থেকে কার্টনের ভেতর রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা যায়, কয়েক মাস আগে অনলাইনে রাকিবের সঙ্গে মামুনের পরিচয় হয়। মামুন একটি মার্কেটিং কোম্পানিতে চাকরি করেন। ঢাকায় আসার পর রাকিব একাধিকবার তার বাসায় গিয়েছিল। এভাবে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। সর্বশেষ ১৬ সেপ্টেম্বর মামুনের বাসায় গেলে রাকিবকে মারধর করা হয় এবং মুক্তিপণের টাকা দিতে চাপ দেওয়া হয়। এ সময় দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি হলে একপর্যায়ে রাকিবের ঘাড় মটকে যায় এবং তার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ কার্টনে ভরে নীলফামারীর ডিমলায় নিয়ে একটি সুপারিবাগানের মাটিতে পুঁতে রাখেন মামুন। এর আগে রাকিবের পরিবারের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন তিনি। টাকা না দিলে রাকিবকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে মোট চার লাখ টাকা পাঠালেও তাকে আর ফিরে পাননি।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ডিএমপির ক্রাইম প্রিভেনশন উত্তর বিভাগের যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম।
ঘটনার আরও বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, রাকিবের মৃত্যুর পর মরদেহ গুম করার উদ্যোগ নেন মামুন। পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিনি মরদেহটি একটি কার্টনে ঢুকিয়ে স্কচটেপ দিয়ে মুড়ে ফেলেন। এরপর বাড়ির দারোয়ানের সহায়তায় কার্টনটি অটোরিকশায় করে গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে যান। কার্টনটি এমনভাবে মোড়ানো হয়েছিল, বাইরে থেকে দেখে সেটির ভেতরে মরদেহ রয়েছে বোঝার উপায় ছিল না। গাবতলী থেকে বাস ও অন্যান্য যানবাহনে করে মামুন নীলফামারীর ডিমলায় নিজের বাড়ির এলাকায় যান। ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে বাড়ির সামনে একটি সুপারিবাগানে গর্ত করেন তিনি। পরে কার্টনসহ রাকিবের মরদেহ সেখানে মাটিচাপা দেন।
এদিকে রাকিব নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যদের কাছে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। মুক্তিপণের অর্থ আদায়ের জন্য পরিবারের সদস্যদের বিভিন্নভাবে বিভ্রান্তও করা হয়। রাকিবকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবারের সদস্যরা চারটি বিকাশ ও তিনটি নগদ নম্বরে মোট চার লাখ টাকা পাঠান। পরে রাকিবকে ফিরে না পেয়ে তাঁর বড় ভাই জহুরুল ইসলাম ঢাকায় এসে কাফরুল থানায় নিখোঁজের জিডি করেন। রাকিবকে হত্যার বিষয়টি জানার পর তিনি অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির ঘটনায় মামলা করেন।
পুলিশ জানায়, ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে রাজধানীর শুক্রাবাদ বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে মামুনকে আটক করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৬ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে ডিমলায় অভিযান চালানো হয়। মামুনের দেখানো জায়গা থেকে কার্টনের ভেতর রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে তাঁর বড় ভাই জহিরুল ইসলাম মরদেহটি শনাক্ত করেন। এরপর ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নীলফামারী আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
রাকিবের পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া চার লাখ টাকার মধ্যে ৫০ হাজার টাকা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। মামুন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে ইচ্ছুক হওয়ায় বুধবার তাকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠানো হয়েছে।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম বলেন, এই হত্যাকাণ্ডে আর কেউ জড়িত কি না, মুক্তিপণের অর্থের লেনদেন এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও জিজ্ঞাসাবাদে রাকিবকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে মামুন। মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।
ডেস্ক নিউজ 





















