খুলনার দিঘলিয়ায় স্কুলে যাওয়ার পথে নবম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—দিনের আলোয়, পরিচিত ও নিয়মিত পথে বের হওয়া একটি শিশু কীভাবে হারিয়ে যেতে পারে, আর এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করছে?
নিখোঁজ শিক্ষার্থীর নাম তাসিন শেখ (১৫)। সে দিঘলিয়া এম. এ. মজিদ মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র। গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে প্রতিদিনের মতো বাড়ি থেকে স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় তাসিন। কিন্তু নির্ধারিত সময়েও সে স্কুলে পৌঁছায়নি। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরিচিত পথ, অস্বাভাবিক নিখোঁজ
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যে পথে তাসিন প্রতিদিন স্কুলে যাতায়াত করত, সেটি তার জন্য নতুন বা ঝুঁকিপূর্ণ কোনো পথ নয়। পরিবারে বা এলাকায় তার কোনো পূর্বশত্রুতা ছিল না, পারিবারিক বিরোধের তথ্যও পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক সময়ে তার আচরণেও কোনো অস্বাভাবিকতার কথা জানায়নি পরিবার। এই প্রেক্ষাপটে, দিনের আলোয় নিয়মিত যাত্রাপথে একজন শিক্ষার্থীর নিখোঁজ হওয়া ঘটনাটি আরও রহস্যজনক হয়ে উঠেছে।
প্রথম ২৪ ঘণ্টা: সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়
নিরাপত্তা ও অনুসন্ধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিখোঁজের পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান শনাক্ত, সম্ভাব্য যাত্রাপথ বিশ্লেষণ, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান দ্রুত শুরু করা প্রয়োজন। তবে এই ঘটনায় প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ঠিক কী ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর দিঘলিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। থানাসূত্রে জানা গেছে, জিডি নম্বর ২৩০, তারিখ ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। পুলিশ জানিয়েছে, অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
স্কুলপথের নিরাপত্তা কোথায়?
তাসিনের নিখোঁজ হওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত বা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সামনে এনে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাসিনের যাতায়াতপথে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। সেখানে নেই পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা, নেই নিয়মিত পুলিশ টহল বা কোনো সংগঠিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে সমন্বিত কোনো “স্কুলপথ নিরাপত্তা কাঠামো” আদৌ কার্যকর আছে কি না।
পরিবার উৎকণ্ঠায়, এলাকাজুড়ে উদ্বেগ
নিখোঁজ তাসিনের পরিবার চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। সন্তানকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় সময় যেন থমকে গেছে তাদের জীবনে। একই সঙ্গে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে উদ্বেগ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাসিনের সন্ধান চেয়ে বিভিন্ন পোস্ট ছড়িয়ে পড়লেও বাস্তব অনুসন্ধানে দৃশ্যমান অগ্রগতির তথ্য সীমিত।
যে প্রশ্নগুলো সামনে এসেছে
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এসেছে—
স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের জন্য কি আলাদা কোনো নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকর আছে?
ঝুঁকিপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ যাতায়াতপথগুলো কি নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়?
নিখোঁজের প্রথম ২৪ ঘণ্টায় অনুসন্ধান কতটা দ্রুত, প্রযুক্তিনির্ভর ও সমন্বিত হয়?
তাসিন এখনো নিখোঁজ। তার সন্ধান পাওয়া যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট জবাব পাওয়া। কারণ একটি শিশুর নিরাপত্তা শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়—এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব।
স্টাফ রিপোর্টার 

















