Dhaka ০৩:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৪০ বছর পর কপিল দেবকে টপকে গেলেন ম্যাক্সওয়েল

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৪০:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ নভেম্বর ২০২৩
  • 292

বিশেষ সংবাদদাতা
ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েও সাহস না হারিয়ে সৃষ্টির অদম্য আকাঙ্ক্ষা, স্পৃহা, প্রাণপণ চেষ্টা এবং খাদের কিনারায় পড়ে থাকা দলকে একা টেনে তোলা; গতকাল ৭ নভেম্বর রাতে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে অসাধ্য সাধন করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এক কথায় হারা ম্যাচে জিতিয়েছেন দলকে। সামনে ২৯২ রানের লক্ষ্য। অথচ ৯১ রানে নেই ৭ উইকেট। ফর্মের চূড়ায় থাকা ডেভিড ওয়ার্নার, মিচেল মার্শ, ট্রাভিস হেডরা সবাই সাজঘরে। এ রকম অবস্থায় ৩৩ রানে চায়নাম্যান নুর আহমেদের বলে মুজিব উর রহমানের কাছে জীবন পেলেন ম্যাক্সওয়েল। আবার পায়ে হ্যামস্ট্রিংয়ের ব্যথা পেয়ে মাটিতে পড়েও রইলেন খানিকক্ষণ। আবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ব্যাট হাতে শুরু হলো যুদ্ধ। লড়াই-সংগ্রাম। এ যুদ্ধ দলকে জেতানোর। এ সংগ্রাম অতলে তলিয়ে গিয়েও তীরে ওঠার। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে সঙ্গে নিয়ে হার না মানা ডাবল সেঞ্চুরি করে দলকে জিতিয়ে রাজ্যজয়ী বীরের মত ম্যাক্সওয়েল ফিরলেন অপরাজিত থেকেই।
মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) রাতে অস্ট্রেলিয়া যখন ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, পরাজয়ের প্রহর গুণছিল, ঠিক সেই অবস্থায় ১২৪ বলে ২০১ রানের সাহসী, তেজোদ্দীপ্ত ইনিংস উপহার দিয়ে ম্যাক্সওয়েল এখন জাতীয় বীর।
মহাকাব্যিক ইনিংসের পর এখন ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা আর সফল নাবিক ভাবা হচ্ছে এই অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডারকে। মেলবোর্নের ৩৫ বছর বয়সী উইলোযোদ্ধাকে নিয়ে চারিদিকে অকুণ্ঠ প্রশংসা, বন্দনা। সবার চোখে মুখে বিস্ময়সূচক বিশেষণ, নিশ্চিত হারের মুখেও এমন আত্মবিশ্বাসী আর তেজোদ্দীপ্ত ব্যাটিং করা যায়! সত্যিই ম্যাক্সওয়েল কল্পলোকের সাহসী যোদ্ধা। অনেকেরই কৌতুহলী প্রশ্ন, একদিনের ক্রিকেটে এটিই কি ইতিহাসের সেরা কামব্যাক? ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়ে আর খাদের কিনারায় পড়ে কে কবে এমন সাহসী আর বিধ্বংসী ইনিংস খেলে দল জিতিয়ে ইতিহাস গড়েছেন? তাও আবার ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে? এককথায় উত্তর দিতে হলে বলতে হবে- নাহ, একদিনের ক্রিকেটে বিশেষ করে বিশ্বকাপে ২৯২ রানের মতো বড় টার্গেট সামনে রেখে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে এত দীর্ঘ ইনিংস, মানে ডাবল সেঞ্চুরি উপহারের রেকর্ড নেই আর কারো। তবে একটি ইনিংসকে তার কাছাকাছি রাখা যায়। সেটা প্রায় ম্যাক্সয়েলের গতকালের ইনিংসের সমপর্যায়ের। সেটা অনেক আগে, ১৯৯৩ সালে। ৪০ বছর আগে এই ওয়ানডে বিশ্বকাপেই দারুণ ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলে ভারতকে জিতিয়েছিলেন দেশটির জীবন্ত কিংবদন্তি কপিল দেব। যার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে দুর্দমনীয় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ভারত প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল, সেই সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার কপিল দেব ওই ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেই আসলে মহাবীর বনে গিয়েছিলেন। রয়েছেন আজ অবধি।
দিনটি ছিল ১৯৮৩ সালের ৮ জুন। যুক্তরাজ্যের টানব্রিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ধুঁকছিল শক্তিশালী ও ফেবারিট ভারত। স্কোরবোর্ডে মাত্র ১৭ রান যোগ হতেই ৫ উইকেট হারিয়ে বসেছিল ভারত। সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাটার সুনিল গাভাস্কার (০), কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত (০), মহিন্দর অমরনাথ (৫), সন্দীপ পাতিল (১) আর যশপাল শর্মা (৯) ফেরেন সাজঘরে। দলের এই করুণ অবস্থায় মাঠে নেমে শক্ত হাতে ভারতের হাল ধরেন কপিল দেব। হিমালয়ের বিশালতা আর চীনের প্রাচীরের দৃঢ়তায় লড়াই শুরু করেন। দুই পেসার রজার বিনি (আজকে বিসিসিআই সভাপতি) ও মদনলাল আর উইকেটরক্ষক সৈয়দ কিরমানি অধিনায়ক কপিল দেবকে সাপোর্ট দেন। প্রাথমিক বিপর্যয় কাটাতে সহযোগিতা করেন রজার বিনি। তিনি আর কপিল দেব ষষ্ঠ উইকেটে ৬০ রান যোগ করেন। রজার বিনি ২২ রানে (৪৮ বলে) ফেরার পর মাত্র ১ রানে আউট হন রবি শাস্ত্রী (এখন বিশ্ববরেণ্য ধারাভাষ্যকার)। ৭৮ রানে ৭ উইকেট খোয়া যায় ভারতের। কপিল দেব একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে খেলতে থাকেন। তারপর অষ্টম ও নবম উইকেটে পেসার মদনলাল (১৭) ও উইকেটরক্ষক ব্যাটার কিরমানি দারুণ সঙ্গ দিলে ভারত বিপদ কাটিয়ে ওঠে। অষ্টম উইকেটে মদনলালকে সাথে নিয়ে কপিল জুড়ে দেন ৬৬ রান। ১৪০ রানে ৮ উইকেট পতনের পর নবম উইকেটে কপিল আর কিরমানি (অপরাজিত ৫৬ বলে ২৪) অবিচ্ছিন্ন ১২২ রান তুলে দিলে ভারত পায় ২৬৬ রানের লড়াকু পুঁজি। ৬০ ওভারের ম্যাচে (তখন বিশ্বকাপ হতো ৬০ ওভারে)।
ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়ে এতটুকু না ঘাবড়ে কপিল দেব উপহার দেন ১৭৫ রানের বিশাল ইনিংস। ১৩৮ বলে ১৬ বাউন্ডারি ও ৬ ছক্কায় সাজানো ওই ইনিংসটি ভারতের বিশ্বকাপ জয়ে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জিম্বাবুয়ের কাছে ১৭ রানে ইনিংসের প্রথম অর্ধেক হারানোর পর বাকি ৩ উইকেটে পাওয়া ২৪৯ রানের ১৭৫ একা কপিল দেবের! বোলারদের কৃতিত্বে ভারত পায় ৩১ রানের ঐতিহাসিক জয়। সে জয়ের রূপকার, স্থপতি কপিল দেবকে তাই ভারতীয়রা শুধু ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক হিসেবেই নন, রক্ষাকর্তা ও ত্রাণকর্তা বলেও মানেন। ৭ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে ম্যাক্সওয়েল সেই কপিল দেবকে টপকে ডাবল সেঞ্চুরিসহ ২০১ রানের হার না মানা ইনিংস উপহার দিয়ে দল জেতানোর নতুন ইতিহাস গড়লেন। পরবর্তী প্রজন্ম ও বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেট অনুরাগীদের দুর্ভাগ্য, ৪০ বছর আগে কপিল দেবের সেই অসীম সাহসী ও লড়াকু ১৭৫ রানের ইনিংসটির কোনো স্পষ্ট ভিডিও ক্লিপ নেই। এখনকার মতো সব ম্যাচ সরাসরি টিভিতে দেখানো হতো না। এখনকার মতো ক্রিকইনফো আর ক্রিকবাজে বল টু বল কমেন্ট্রিও হতো না। রেডিও কমেন্ট্রিই ছিল ভরসা। ম্যাক্সওয়েলের মতো ১০ ছক্কা আর ২১ বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করা আর কপিল দেবের মতো ১৭৫ রানের বিরাট ইনিংস উপহার দিতে পারেননি আর কেউ। তবে আরও একজন ক্রিকেটার বিশ্বকাপের ম্যাচে ভগ্নস্তুপের মাঝে দাঁড়িয়ে অমন সাহসী ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে নিজেকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন। তিনি হলেন স্টিভ ওয়াহ। সাবেক ও সফল এই অসি অধিনায়ক ১৯৯৯ সালের ১৩ জুন ইংল্যান্ডের লর্ডসে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে হার না মানা সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে জিতিয়েছিলেন। প্রোটিয়াদের করা ২৭১ রান তাড়া করে মার্ক ওয়াহ, এডাম গিলক্রিস্ট ও ড্যারেন লেহম্যান আউট হলে ৪৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে শুরুতে বিপদে পড়ে গিয়েছিল অসিরা।পাঁচ নম্বরে নেমে শক্ত হাতে হাল ধরেন অসি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ।
মঙ্গলবার মুম্বাইয়ে আফগান স্পিনার নুর আহমেদের বলে যেমন মুজিব-উর রহমান গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচ ফেলে দিয়েছেন, একইভাবে সেই ম্যাচে স্টিভ ওয়াহর ক্যাচ ফেলে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার হারশেল গিবস।
শেষ পর্যন্ত লড়াকু শতক উপহার (১১০ বলে ১২০) দিয়ে ২ বল বাকি থাকতেই দলকে জিতিয়ে বিজয়ীর বেশে ড্রেসিংরুমে ফেরেন স্টিভ ওয়াহ।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Deen Md

জনপ্রিয়

৪০ বছর পর কপিল দেবকে টপকে গেলেন ম্যাক্সওয়েল

Update Time : ০৭:৪০:৫৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ নভেম্বর ২০২৩

বিশেষ সংবাদদাতা
ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়েও সাহস না হারিয়ে সৃষ্টির অদম্য আকাঙ্ক্ষা, স্পৃহা, প্রাণপণ চেষ্টা এবং খাদের কিনারায় পড়ে থাকা দলকে একা টেনে তোলা; গতকাল ৭ নভেম্বর রাতে মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে অসাধ্য সাধন করেছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। আফগানিস্তানের বিপক্ষে এক কথায় হারা ম্যাচে জিতিয়েছেন দলকে। সামনে ২৯২ রানের লক্ষ্য। অথচ ৯১ রানে নেই ৭ উইকেট। ফর্মের চূড়ায় থাকা ডেভিড ওয়ার্নার, মিচেল মার্শ, ট্রাভিস হেডরা সবাই সাজঘরে। এ রকম অবস্থায় ৩৩ রানে চায়নাম্যান নুর আহমেদের বলে মুজিব উর রহমানের কাছে জীবন পেলেন ম্যাক্সওয়েল। আবার পায়ে হ্যামস্ট্রিংয়ের ব্যথা পেয়ে মাটিতে পড়েও রইলেন খানিকক্ষণ। আবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ব্যাট হাতে শুরু হলো যুদ্ধ। লড়াই-সংগ্রাম। এ যুদ্ধ দলকে জেতানোর। এ সংগ্রাম অতলে তলিয়ে গিয়েও তীরে ওঠার। অধিনায়ক প্যাট কামিন্সকে সঙ্গে নিয়ে হার না মানা ডাবল সেঞ্চুরি করে দলকে জিতিয়ে রাজ্যজয়ী বীরের মত ম্যাক্সওয়েল ফিরলেন অপরাজিত থেকেই।
মঙ্গলবার (৭ নভেম্বর) রাতে অস্ট্রেলিয়া যখন ৯১ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছিল, পরাজয়ের প্রহর গুণছিল, ঠিক সেই অবস্থায় ১২৪ বলে ২০১ রানের সাহসী, তেজোদ্দীপ্ত ইনিংস উপহার দিয়ে ম্যাক্সওয়েল এখন জাতীয় বীর।
মহাকাব্যিক ইনিংসের পর এখন ক্রিকেট দুনিয়ার সবচেয়ে সাহসী যোদ্ধা আর সফল নাবিক ভাবা হচ্ছে এই অস্ট্রেলিয়ান অলরাউন্ডারকে। মেলবোর্নের ৩৫ বছর বয়সী উইলোযোদ্ধাকে নিয়ে চারিদিকে অকুণ্ঠ প্রশংসা, বন্দনা। সবার চোখে মুখে বিস্ময়সূচক বিশেষণ, নিশ্চিত হারের মুখেও এমন আত্মবিশ্বাসী আর তেজোদ্দীপ্ত ব্যাটিং করা যায়! সত্যিই ম্যাক্সওয়েল কল্পলোকের সাহসী যোদ্ধা। অনেকেরই কৌতুহলী প্রশ্ন, একদিনের ক্রিকেটে এটিই কি ইতিহাসের সেরা কামব্যাক? ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়ে আর খাদের কিনারায় পড়ে কে কবে এমন সাহসী আর বিধ্বংসী ইনিংস খেলে দল জিতিয়ে ইতিহাস গড়েছেন? তাও আবার ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে? এককথায় উত্তর দিতে হলে বলতে হবে- নাহ, একদিনের ক্রিকেটে বিশেষ করে বিশ্বকাপে ২৯২ রানের মতো বড় টার্গেট সামনে রেখে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে এত দীর্ঘ ইনিংস, মানে ডাবল সেঞ্চুরি উপহারের রেকর্ড নেই আর কারো। তবে একটি ইনিংসকে তার কাছাকাছি রাখা যায়। সেটা প্রায় ম্যাক্সয়েলের গতকালের ইনিংসের সমপর্যায়ের। সেটা অনেক আগে, ১৯৯৩ সালে। ৪০ বছর আগে এই ওয়ানডে বিশ্বকাপেই দারুণ ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলে ভারতকে জিতিয়েছিলেন দেশটির জীবন্ত কিংবদন্তি কপিল দেব। যার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে দুর্দমনীয় ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে ভারত প্রথম বিশ্বকাপ জিতেছিল, সেই সর্বকালের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার কপিল দেব ওই ম্যাচজয়ী ইনিংস খেলেই আসলে মহাবীর বনে গিয়েছিলেন। রয়েছেন আজ অবধি।
দিনটি ছিল ১৯৮৩ সালের ৮ জুন। যুক্তরাজ্যের টানব্রিজে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ধুঁকছিল শক্তিশালী ও ফেবারিট ভারত। স্কোরবোর্ডে মাত্র ১৭ রান যোগ হতেই ৫ উইকেট হারিয়ে বসেছিল ভারত। সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যাটার সুনিল গাভাস্কার (০), কৃষ্ণমাচারী শ্রীকান্ত (০), মহিন্দর অমরনাথ (৫), সন্দীপ পাতিল (১) আর যশপাল শর্মা (৯) ফেরেন সাজঘরে। দলের এই করুণ অবস্থায় মাঠে নেমে শক্ত হাতে ভারতের হাল ধরেন কপিল দেব। হিমালয়ের বিশালতা আর চীনের প্রাচীরের দৃঢ়তায় লড়াই শুরু করেন। দুই পেসার রজার বিনি (আজকে বিসিসিআই সভাপতি) ও মদনলাল আর উইকেটরক্ষক সৈয়দ কিরমানি অধিনায়ক কপিল দেবকে সাপোর্ট দেন। প্রাথমিক বিপর্যয় কাটাতে সহযোগিতা করেন রজার বিনি। তিনি আর কপিল দেব ষষ্ঠ উইকেটে ৬০ রান যোগ করেন। রজার বিনি ২২ রানে (৪৮ বলে) ফেরার পর মাত্র ১ রানে আউট হন রবি শাস্ত্রী (এখন বিশ্ববরেণ্য ধারাভাষ্যকার)। ৭৮ রানে ৭ উইকেট খোয়া যায় ভারতের। কপিল দেব একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে লড়াই চালিয়ে খেলতে থাকেন। তারপর অষ্টম ও নবম উইকেটে পেসার মদনলাল (১৭) ও উইকেটরক্ষক ব্যাটার কিরমানি দারুণ সঙ্গ দিলে ভারত বিপদ কাটিয়ে ওঠে। অষ্টম উইকেটে মদনলালকে সাথে নিয়ে কপিল জুড়ে দেন ৬৬ রান। ১৪০ রানে ৮ উইকেট পতনের পর নবম উইকেটে কপিল আর কিরমানি (অপরাজিত ৫৬ বলে ২৪) অবিচ্ছিন্ন ১২২ রান তুলে দিলে ভারত পায় ২৬৬ রানের লড়াকু পুঁজি। ৬০ ওভারের ম্যাচে (তখন বিশ্বকাপ হতো ৬০ ওভারে)।
ধ্বংসের মাঝে দাঁড়িয়ে এতটুকু না ঘাবড়ে কপিল দেব উপহার দেন ১৭৫ রানের বিশাল ইনিংস। ১৩৮ বলে ১৬ বাউন্ডারি ও ৬ ছক্কায় সাজানো ওই ইনিংসটি ভারতের বিশ্বকাপ জয়ে রাখে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। জিম্বাবুয়ের কাছে ১৭ রানে ইনিংসের প্রথম অর্ধেক হারানোর পর বাকি ৩ উইকেটে পাওয়া ২৪৯ রানের ১৭৫ একা কপিল দেবের! বোলারদের কৃতিত্বে ভারত পায় ৩১ রানের ঐতিহাসিক জয়। সে জয়ের রূপকার, স্থপতি কপিল দেবকে তাই ভারতীয়রা শুধু ভারতের বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক হিসেবেই নন, রক্ষাকর্তা ও ত্রাণকর্তা বলেও মানেন। ৭ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়েতে ম্যাক্সওয়েল সেই কপিল দেবকে টপকে ডাবল সেঞ্চুরিসহ ২০১ রানের হার না মানা ইনিংস উপহার দিয়ে দল জেতানোর নতুন ইতিহাস গড়লেন। পরবর্তী প্রজন্ম ও বর্তমান প্রজন্মের ক্রিকেট অনুরাগীদের দুর্ভাগ্য, ৪০ বছর আগে কপিল দেবের সেই অসীম সাহসী ও লড়াকু ১৭৫ রানের ইনিংসটির কোনো স্পষ্ট ভিডিও ক্লিপ নেই। এখনকার মতো সব ম্যাচ সরাসরি টিভিতে দেখানো হতো না। এখনকার মতো ক্রিকইনফো আর ক্রিকবাজে বল টু বল কমেন্ট্রিও হতো না। রেডিও কমেন্ট্রিই ছিল ভরসা। ম্যাক্সওয়েলের মতো ১০ ছক্কা আর ২১ বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ডাবল সেঞ্চুরি করা আর কপিল দেবের মতো ১৭৫ রানের বিরাট ইনিংস উপহার দিতে পারেননি আর কেউ। তবে আরও একজন ক্রিকেটার বিশ্বকাপের ম্যাচে ভগ্নস্তুপের মাঝে দাঁড়িয়ে অমন সাহসী ইনিংস খেলে দলকে জিতিয়ে নিজেকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছেন। তিনি হলেন স্টিভ ওয়াহ। সাবেক ও সফল এই অসি অধিনায়ক ১৯৯৯ সালের ১৩ জুন ইংল্যান্ডের লর্ডসে বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে হার না মানা সেঞ্চুরিতে অস্ট্রেলিয়াকে ৫ উইকেটে জিতিয়েছিলেন। প্রোটিয়াদের করা ২৭১ রান তাড়া করে মার্ক ওয়াহ, এডাম গিলক্রিস্ট ও ড্যারেন লেহম্যান আউট হলে ৪৮ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে শুরুতে বিপদে পড়ে গিয়েছিল অসিরা।পাঁচ নম্বরে নেমে শক্ত হাতে হাল ধরেন অসি অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ।
মঙ্গলবার মুম্বাইয়ে আফগান স্পিনার নুর আহমেদের বলে যেমন মুজিব-উর রহমান গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচ ফেলে দিয়েছেন, একইভাবে সেই ম্যাচে স্টিভ ওয়াহর ক্যাচ ফেলে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার হারশেল গিবস।
শেষ পর্যন্ত লড়াকু শতক উপহার (১১০ বলে ১২০) দিয়ে ২ বল বাকি থাকতেই দলকে জিতিয়ে বিজয়ীর বেশে ড্রেসিংরুমে ফেরেন স্টিভ ওয়াহ।