নিজস্ব প্রতিনিধি
২০২৬ সালের ১১ জুন মেক্সিকোতে বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হবে। সেই উপলক্ষ্যে ফিফা দুই বছর আগেই ক্ষণ গণনা শুরু করে দেয়। ফিফার ক্ষণ গণনার দিনে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বাছাইয়ের যাত্রায় সমাপ্তি ঘটে। কারণ একই তারিখেই (১১ জুন) বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশ লেবাননের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচ হারে ৪-০ গোলে।
ছয় ম্যাচ শেষে বাংলাদেশের অবস্থান হয় গ্রুপের তলানিতে। সংগ্রহ মাত্র এক পয়েন্ট। এর চেয়েও দৃষ্টিকটু ৬ ম্যাচে ২০ গোল হজমের বিপরীতে প্রতিপক্ষের জালে মাত্র ১ গোল।
খেলায় হার-জিত রয়েছে, ফুটবলের সৌন্দর্য্যও গোলে। বাংলাদেশ ফুটবল দল এতে চরম ব্যর্থ। এবার বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ম্যাচপ্রতি গোল হজমের হার যেখানে প্রায় সাড়ে ৩, আর গোল করার হার সেখানে ০.১৭। শুধু এবারই নয় বিশ্বকাপ বাছাইয়ের সামগ্রিক হিসেবেই বাংলাদেশের গোলের হার ম্যাচপ্রতি একের নিচে।
বাংলাদেশ ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ থেকে বাছাইয়ে অংশ নিচ্ছে। এই পর্যন্ত মোট ১১ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৬৬ ম্যাচ খেলেছে লাল-সবুজ বাহিনী। যেখানে বাংলাদেশের গোল মাত্র ৪১টি। যা ম্যাচপ্রতি মোটে ০.৬২। পক্ষান্তরে গোল হজম করেছে ১৬৬টি, ম্যাচ প্রতি গড় ২.৫১।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু। বিশ্বকাপ বাছাইয়েও প্রথম গোল তার। ১৯৮৫ সালের ৩০ মার্চ ভারতের বিপক্ষে গোল করা সাবেক এই তারকা বলেন, ‘আসলে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আমাদের চেয়ে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পড়ে, তাই আমাদের গোলের হার কম। তাছাড়া বিশ্বকাপ বা এশিয়ান কাপ বাছাইয়ে আমাদের কোচদের লক্ষ্যই থাকে ডিফেন্সিভ খেলা অথবা কাউন্টার অ্যাটাক। তাই গোল সংখ্যাও হয় কম।’ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক জাহিদ হাসান এমিলিও চুন্নুর সঙ্গে একমত। তার পর্যবেক্ষণ, ‘বিশ্বকাপ বাছাইয়ে আমরা বড় দলগুলোর সঙ্গে গোলের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারি না। আমাদের যা গোল তা সমশক্তির বা একটু ওপরের দলের সঙ্গে।’
সাবেক দুই তারকা ফুটবলার কোচের কৌশল ও নিজেদের সামর্থ্যের অপারগতা প্রকাশ করলেও ফুটবলারদের ব্যক্তিগত স্কিল-দক্ষতাও বড় বিষয়। বিশ্বকাপ বাছাইকে একবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ভাগ করলে সেটা আরও স্পষ্ট হবে। ২০০২-২৬ সাত বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের গোল মাত্র ২১টি। আর আগের চার বাছাইয়ে ১৯৮৬-৯৮ গোল সংখ্যা ২০। গোল সংখ্যার বিচারে নয়, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ম্যাচ হারের ব্যবধানেও স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের গোল এখন পর্যন্ত ৪১টি। এর মধ্যে একটি আত্মঘাতী। ৪০ গোলের মধ্যে সর্বোচ্চ তিনটি করে করেছেন তিনজন। এর মধ্যে রয়েছেন সদ্য সাবেক ফুটবলার জাহিদ হাসান এমিলি। তার সঙ্গী মামুন জোয়ার্দার ও আলফাজ আহমেদ। দুটি করে গোল আছে সাতজনের। আশরাফউদ্দিন আহমেদ চুন্নু, সৈয়দ রুম্মন বিন ওয়ালী সাব্বির, জুয়েল রানা, সুজন, রিজভী করিম রুমি, কায়সার হামিদের মতো কিংবদন্তির পাশে এই তালিকায় রয়েছেন বর্তমান প্রজন্মের সাদ উদ্দিন। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে একাধিক গোলদাতার সংখ্যা ১০ জন হলেও, এক ম্যাচে জোড়া গোলের কীর্তি শুধু সুজন, আলফাজ ও মামুন জোয়ার্দারের।
ফুটবলে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয় গোলে। গোলের সংখ্যা যখন কম, ফলে ম্যাচ জয়ও কম। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে বাংলাদেশের ৬৬ ম্যাচের মধ্যে জয় মাত্র ১১টি, হার ৪৫ ও ড্র ১০টিতে। সেই জয়ের হিসেবেও আশি-নব্বই দশকের পরিসংখ্যান–ই এগিয়ে। ১৯৮৬-৯৮ এই চার বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জয় ৬টি। এরপর বাকি সাত বিশ্বকাপ বাছাই মিলিয়ে জয় মাত্র পাঁচটি। সেই পাঁচটির মধ্যে মাত্র একটি জয়ই মূল বিশ্বকাপ বাছাইয়ে। সেটা ২০০১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি, মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে ৩-০ গোলে। বাকি চার জয় মালদ্বীপ, লাওস, পাকিস্তান ও লেবাননের বিপক্ষে। এ সবগুলো প্রাক বাছাই/প্লে অফ ম্যাচে। ২০১৮ ও ২০২২ সালে প্লে-অফ উৎরে মূল বাছাই খেললেও, ২০০৬-১৪ সালে মূল বাছাই–ও খেলতেই পারেনি বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ফুটবলের মূলপর্বে আদৌ খেলতে পারবে কি না এটা বড় প্রশ্ন। তবে এশিয়া কাপের মূল পর্বে খেলেছিল দলটি। ১৯৮০ সালে কুয়েতে বাংলাদেশ এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে অংশ নিয়েছিল ৭৯ সালের বাছাই উৎরে। এশিয়া কাপ খেলা দল ৮২ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে কেন অংশ নেয়নি সেটি এক বিস্ময়। কিংবদন্তি ফুটবলার আশরাফ উদ্দিন আহমেদ চুন্নুর মনে এখনও সেই প্রশ্ন, ‘১৯৮৫ সালে হঠাৎ শুনি আমরা বিশ্বকাপ বাছাই খেলব। সবাই খুব খুশি হয়েছিলাম এই ভেবে যে বিশ্বকাপের সঙ্গী হচ্ছে বাংলাদেশ। তৎক্ষণাত–ই মনে প্রশ্ন উঠেছিল আমরা আগের বিশ্বকাপ বাছাই (১৯৮২, ইতালি) কেন খেললাম না। সঠিক উত্তর পাইনি। নিজ থেকে অনুমান করি ফিফা-এএফসি’র সঙ্গে সেই সময় ফেডারেশন সঠিকভাবে যোগাযোগ করেনি বা আগ্রহ দেখায়নি খেলার।’
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীনতার পরপরই গঠিত হয় বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সদস্যপদ পায় ১৯৭৬ সালে। সদস্য হওয়ার পর ১৯৭৮ ও ৮২ সালে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে অংশ নেয়নি। ১৯৮৬ সাল থেকে অদ্যবধি নিয়মিত অংশগ্রহণ করছে।
Reporter Name 

























