হাইওয়ে পুলিশের সার্জেন্ট পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তিনজন প্রতারককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), খুলনা জেলা। এ সময় প্রতারণায় ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, সিম, ওয়াকিটকি সেট, পুলিশের লোগো সম্বলিত ফর্ম ও ভুয়া ভিজিটিং কার্ডসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করা হয়েছে।
পিবিআই সূত্রে জানা যায়, খুলনা জেলার সোনাডাঙ্গা থানাধীন শেখপাড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত আব্দুল সালামের ছেলে মোঃ শুকুর আলী (৩৮) পেশায় একজন পিকআপ গাড়িচালক। পাশাপাশি তার মালিকানায় সাতটি অটোরিকশা রয়েছে, যা দৈনিক ভাড়াভিত্তিতে বিভিন্ন চালকের কাছে দেওয়া হয়। তার একটি অটোরিকশার চালক মোঃ আরিফ গত ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গাড়ি চালানোর সময় এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হন। ওই ব্যক্তি নিজেকে হাইওয়ে পুলিশের সার্জেন্ট পরিচয় দিয়ে জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে পুরাতন অটোরিকশার ব্যাটারি নিলামের মাধ্যমে কম দামে বিক্রি করা হয়। তিনি মোঃ তরিকুল ইসলাম, সার্জেন্ট, বাংলাদেশ পুলিশ নামীয় একটি ভিজিটিং কার্ড দিয়ে ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে বলেন।
পরবর্তীতে মোঃ শুকুর আলী উক্ত ভিজিটিং কার্ডে থাকা মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে অপর প্রান্ত থেকে একজন ব্যক্তি নিজেকে বাংলাদেশ পুলিশের সার্জেন্ট পরিচয় দিয়ে একই কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তার কথায় বিশ্বাস করে শুকুর আলী নিলামের মাধ্যমে পুরাতন ব্যাটারি কেনার সম্মতি জানান। তখন প্রতারক চক্র অগ্রিম হিসেবে তার ব্যবহৃত নগদ নম্বরে ৩ হাজার টাকা পাঠাতে বলে। সরল বিশ্বাসে শুকুর আলী ৮ জানুয়ারি রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে ওই নম্বরে ৩ হাজার টাকা পাঠান।
এরপর ৯ জানুয়ারি বেলা ১১টার দিকে প্রতারক তাকে ফোন করে সোনাডাঙ্গা আল ফারুক মোড়ে যেতে বলেন। সেখানে একজন লোকের কাছে ৮২ হাজার টাকা দিয়ে একটি চালান সংগ্রহ করতে বলা হয় এবং চালান নিয়ে বয়রা পুলিশ লাইন্সে গেলে ব্যাটারি সরবরাহ করা হবে বলে জানানো হয়। নির্ধারিত স্থানে গেলে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি নিজেকে কথিত সার্জেন্ট তরিকুল ইসলামের সিনিয়র পরিচয় দিয়ে ফোনে কথা বলিয়ে নেয়। পরে শুকুর আলী তার কাছে নগদ ৮২ হাজার টাকা প্রদান করেন। ওই ব্যক্তি বড় ২০টি ও ছোট ২০টি পুরাতন ব্যাটারির একটি চালান দিয়ে বয়রা পুলিশ লাইন্সের সামনে অপেক্ষা করতে বলেন।
দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর ব্যাটারি না পেয়ে শুকুর আলী ফোন করলে প্রতারকরা আরও টাকা দাবি করে এবং টাকা না দিলে ব্যাটারি সরবরাহ বা আগের টাকা ফেরত না দেওয়ার হুমকি দেয়। তখনই তিনি বুঝতে পারেন, হাইওয়ে পুলিশের সার্জেন্ট পরিচয়ে প্রতারণার মাধ্যমে তার কাছ থেকে মোট ৮৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি পিবিআই খুলনা জেলা অফিসে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগের প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়ার পর পিবিআই প্রধান মোঃ মোস্তফা কামাল, অ্যাডিশনাল আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ-এর দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই খুলনা জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন, পিপিএম-সেবা-এর নেতৃত্বে একটি চৌকস দল অভিযান পরিচালনা করে। এসআই (নিঃ) রেজোয়ান, এসআই (নিঃ) মোঃ সোহানুর রহমান, এসআই (নিঃ) খোন্দকার নাঈম-উল-ইসলাম ও এসআই (নিঃ) মোঃ মাসুদুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত দল ১২ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে খুলনা, যশোর ও মাগুরা জেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালায়।
একই দিন রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে মাগুরা সদর থানাধীন ঢাকা রোডের একতা কাঁচা বাজার আড়ত সংলগ্ন হোটেল রয়েল (আবাসিক) থেকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত এসএম শাহিন (৫০), মোঃ নাজমুল হাসান (৩২) ও ওবায়দুল বিশ্বাস (৩৪)কে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের হেফাজত থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত চারটি মোবাইল ফোন, একাধিক সিমকার্ড, একটি ওয়াকিটকি সেট, সার্জেন্ট মোঃ তরিকুল ইসলামসহ বিভিন্ন সার্জেন্টের নামযুক্ত ভুয়া ভিজিটিং কার্ড এবং পুলিশের লোগো সংবলিত একাধিক ফর্ম উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায় মোঃ শুকুর আলী বাদী হয়ে সোনাডাঙ্গা থানায় মামলা নং-১৩, তারিখ ১৩ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রি., দণ্ডবিধির ১৭০/১৭১/৪০৬/৪২০ ধারায় মামলা দায়ের করেন। পরবর্তীতে মামলাটি পিবিআই খুলনা জেলা স্বউদ্যোগে গ্রহণ করে এবং তদন্তভার এসআই (নিঃ) খোন্দকার নাঈম-উল-ইসলামের ওপর অর্পণ করা হয়। গ্রেফতারকৃত আসামিদের বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে এবং পলাতক অন্যান্য আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মামলার তদন্ত তদারকি করছেন পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন, পিপিএম-সেবা, পিবিআই খুলনা জেলা এবং তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করছেন এসআই (নিঃ) খোন্দকার নাঈম-উল-ইসলাম।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















