যাত্রীবেশে হাতুড়ির আঘাত করে রিকশা ছিনতাই : মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন রিকশাচালক রনি

খুলনা নগরীতে রিকশাচালকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে যাত্রীবেশে দুর্বৃত্তের হামলায় এক রিকশাচালকের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। ভোরের অন্ধকারে মাথায় হাতুড়ির আঘাত করে রিকশা ছিনতাইয়ের পর আহত চালক এখন ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। অস্ত্রোপচারের পরও তার জ্ঞান ফেরেনি।

মঙ্গলবার ভোরে নগরীর বড় মির্জাপুর ক্রসরোড এলাকায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় আহত রিকশাচালকের নাম রনি (২৮)। তিনি খালিশপুর পিপলস কলোনী মানসী বিলিং মোড় এলাকার বাসিন্দা আফসার গোলদারের ছেলে।

ফজরের নামাজের পর রাস্তায়, ফিরলেন রক্তাক্ত অবস্থায়:

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার ভোরে ফজরের নামাজের পর রনি তার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি গ্যারেজ থেকে বের করেন। মাত্র এক মাস আগে একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কেনা রিকশাটিই ছিল তার পরিবারের একমাত্র জীবিকা। সাত বছরের ছেলেকে স্কুলে পাঠানো, সংসারের খরচ—সবই চলত এই রিকশার আয়ে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রনি যাত্রী নিয়ে বড় মির্জাপুর রোড হয়ে মির্জাপুর ক্রসরোড এলাকায় পৌঁছালে যাত্রী হঠাৎ তার মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় রনিকে রাস্তায় ফেলে রেখে রিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্ত।

স্থানীয়রা জানান, ভোরের নীরবতায় রনির চিৎকার শুনে তারা ছুটে আসেন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।

খুলনা থেকে ঢাকা: অস্ত্রোপচারের পরও ফেরেনি জ্ঞান:

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, রনির মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে এবং অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার দুপুরে তাকে ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হলেও এখনও তিনি জ্ঞান ফিরে পাননি। চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“রিকশাটাই ছিল সব”—ভেঙে পড়েছে পরিবার:

রনির স্ত্রী মুক্তা বলেন, “রিকশা চালিয়েই আমাদের সংসার চলত। এক মাস আগে ঋণ করে রিকশাটা কিনেছিলাম। এখন আমার স্বামী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, আর রিকশাটাও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। সংসার চালাব কীভাবে বুঝতে পারছি না।”

তিনি জানান, রনি শুধু রিকশাচালক নন, প্রয়োজনে মিস্ত্রির কাজও করতেন। কিন্তু আহত হওয়ার পর পরিবার কার্যত আয়হীন হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ ছাড়াই তদন্ত, সিসিটিভিতে ভরসা পুলিশের:

খুলনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কবির হোসেন জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্বৃত্তকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

তবে খুলনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল জানান, এখনো পর্যন্ত থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। আহত রনির স্বজনরা অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তিনি জানান।

নগরজুড়ে প্রশ্ন: ভোরের রাস্তায় নিরাপত্তা কোথায়?

ঘটনাটি খুলনা নগরীতে রিকশাচালকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভোর ও গভীর রাতে যাত্রীবেশে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বাড়লেও টহল বা নজরদারি তেমন চোখে পড়ে না।

রিকশাচালকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যাত্রী চিনব কীভাবে? প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে।”

শুধু একটি ঘটনা নয়, একটি বাস্তবতা:

রিকশাচালক রনির ওপর হামলার ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি নগরীর অনিরাপদ রাত, অনিশ্চিত জীবিকা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ভঙ্গুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এক আঘাতে থেমে গেছে একটি পরিবারের জীবনচাকা।
এখন রনির পরিবার তাকিয়ে আছে হাসপাতালের শয্যার দিকে, আর নগরবাসী অপেক্ষায়—এই ঘটনায় আদৌ কি ধরা পড়বে হামলাকারী?

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Deen Md

যাত্রীবেশে হাতুড়ির আঘাত করে রিকশা ছিনতাই : মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন রিকশাচালক রনি

Update Time : ০৩:০৬:৫৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

খুলনা নগরীতে রিকশাচালকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে যাত্রীবেশে দুর্বৃত্তের হামলায় এক রিকশাচালকের গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা। ভোরের অন্ধকারে মাথায় হাতুড়ির আঘাত করে রিকশা ছিনতাইয়ের পর আহত চালক এখন ঢাকার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। অস্ত্রোপচারের পরও তার জ্ঞান ফেরেনি।

মঙ্গলবার ভোরে নগরীর বড় মির্জাপুর ক্রসরোড এলাকায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় আহত রিকশাচালকের নাম রনি (২৮)। তিনি খালিশপুর পিপলস কলোনী মানসী বিলিং মোড় এলাকার বাসিন্দা আফসার গোলদারের ছেলে।

ফজরের নামাজের পর রাস্তায়, ফিরলেন রক্তাক্ত অবস্থায়:

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিদিনের মতো মঙ্গলবার ভোরে ফজরের নামাজের পর রনি তার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটি গ্যারেজ থেকে বের করেন। মাত্র এক মাস আগে একটি এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কেনা রিকশাটিই ছিল তার পরিবারের একমাত্র জীবিকা। সাত বছরের ছেলেকে স্কুলে পাঠানো, সংসারের খরচ—সবই চলত এই রিকশার আয়ে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রনি যাত্রী নিয়ে বড় মির্জাপুর রোড হয়ে মির্জাপুর ক্রসরোড এলাকায় পৌঁছালে যাত্রী হঠাৎ তার মাথায় হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে। গুরুতর আহত অবস্থায় রনিকে রাস্তায় ফেলে রেখে রিকশাটি নিয়ে পালিয়ে যায় দুর্বৃত্ত।

স্থানীয়রা জানান, ভোরের নীরবতায় রনির চিৎকার শুনে তারা ছুটে আসেন। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।

খুলনা থেকে ঢাকা: অস্ত্রোপচারের পরও ফেরেনি জ্ঞান:

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, রনির মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে এবং অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, মঙ্গলবার দুপুরে তাকে ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরদিন বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সকালে তার মাথায় অস্ত্রোপচার করা হলেও এখনও তিনি জ্ঞান ফিরে পাননি। চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

“রিকশাটাই ছিল সব”—ভেঙে পড়েছে পরিবার:

রনির স্ত্রী মুক্তা বলেন, “রিকশা চালিয়েই আমাদের সংসার চলত। এক মাস আগে ঋণ করে রিকশাটা কিনেছিলাম। এখন আমার স্বামী হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে, আর রিকশাটাও ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। সংসার চালাব কীভাবে বুঝতে পারছি না।”

তিনি জানান, রনি শুধু রিকশাচালক নন, প্রয়োজনে মিস্ত্রির কাজও করতেন। কিন্তু আহত হওয়ার পর পরিবার কার্যত আয়হীন হয়ে পড়েছে।

অভিযোগ ছাড়াই তদন্ত, সিসিটিভিতে ভরসা পুলিশের:

খুলনা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. কবির হোসেন জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশ ঘটনাস্থলের আশপাশের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে দুর্বৃত্তকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

তবে খুলনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) রুবেল জানান, এখনো পর্যন্ত থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। আহত রনির স্বজনরা অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে তিনি জানান।

নগরজুড়ে প্রশ্ন: ভোরের রাস্তায় নিরাপত্তা কোথায়?

ঘটনাটি খুলনা নগরীতে রিকশাচালকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ভোর ও গভীর রাতে যাত্রীবেশে ছিনতাইকারীদের তৎপরতা বাড়লেও টহল বা নজরদারি তেমন চোখে পড়ে না।

রিকশাচালকরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যাত্রী চিনব কীভাবে? প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নামতে হচ্ছে।”

শুধু একটি ঘটনা নয়, একটি বাস্তবতা:

রিকশাচালক রনির ওপর হামলার ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়—এটি নগরীর অনিরাপদ রাত, অনিশ্চিত জীবিকা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ভঙ্গুর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এক আঘাতে থেমে গেছে একটি পরিবারের জীবনচাকা।
এখন রনির পরিবার তাকিয়ে আছে হাসপাতালের শয্যার দিকে, আর নগরবাসী অপেক্ষায়—এই ঘটনায় আদৌ কি ধরা পড়বে হামলাকারী?