চলতি বছরে নগরীসহ জেলায় ৭২ খুন

জিডি করেও রক্ষা নেই, বডিগার্ড রেখেও বাঁচা দায়—খুলনায় থামছে না হত্যার মিছিল

প্রাণনাশের আশঙ্কা করেছিলেন আক্তার ঢালি। ছেলে হত্যার মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে—এমন অভিযোগ জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তিনি। স্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি পুলিশের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তার আবেদন জানানোর ১৫ দিনের মধ্যেই গুলিতে প্রাণ হারান আক্তার ঢালি।

দিঘলিয়ায় আবার অস্ত্রধারী বডিগার্ড সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হয়েছেন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম। এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ৭ অক্টোবর সকালে দৌলতপুরের ব্রজলাল কলেজের (বিএল কলেজ) দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন মহিদুল ইসলাম (২৫) নামে এক যুবক।

একজন নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও রক্ষা পাননি। আরেকজনের পাশে ছিল অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী। তারপরও প্রকাশ্য হামলা ঠেকানো যায়নি। সাম্প্রতিক এসব ঘটনা খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—হুমকি বা অপরাধের পূর্বাভাস থাকার পরও সহিংসতা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?

নগরী-জেলায় ৭২ হত্যাকাণ্ড

পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও জেলায় অন্তত ৭২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটেছে প্রকাশ্যে। গুলি, কুপিয়ে হত্যা, শ্বাসরোধ ও গণপিটুনিসহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ গেছে মানুষের।

পুলিশের হিসাবে, এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। তবে সব মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম একই পর্যায়ে নেই।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৩টি। একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি মামলা হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের তুলনায় মামলার সংখ্যা কম। পুলিশের হিসাবে, ১৯টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে এবং এসব মামলায় ৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া ১৯টি মামলার মধ্যে ১৭টি তদন্তাধীন এবং দুটি বিচারাধীন। ১৪টি মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নয়টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ। সাতটি ঘটনায় মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব, দুটি ঘটনায় ইজিবাইক চুরি এবং একটি ঘটনায় চোর সন্দেহে গণপিটুনির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে গুলিতে নয়জন, মাদক-সংক্রান্ত ঘটনায় কুপিয়ে তিনজন, সামাজিক ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধে ১৩ জন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দুজন, অজ্ঞাত ঘটনায় দুজন, শ্বাসরোধে দুজন এবং পারিবারিক বিরোধে চারজন নিহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা চেয়েও বাঁচতে পারেননি আক্তার ঢালি

রূপসার আক্তার ঢালির হত্যাকাণ্ডটি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।

গত ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী এলাকায় নৃশংসভাবে গলাকেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় তার ছেলে জয় ঢালিকে। এ ঘটনায় জয় ঢালির মা নাসিমা বেগম ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

এরপর মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল্লা ও রোপা মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি রূপসা পুলিশের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন আক্তার ঢালি ও তার পরিবার।

পরে ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় জিডি করেন আক্তার ঢালি।

জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, তার ছেলে জয় ঢালি হত্যার মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলাকায় ফিরে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তার ও পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জানমালের ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন।

কিন্তু জিডি করার ১৫ দিনের মাথায়, গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রূপসার দুর্জনীমহল শহীদের মোড়ের ঢালি বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় আক্তার ঢালিকে।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার জাহিদ আক্তার ঢালির জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, কী কারণে এবং কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বডিগার্ডও ঠেকাতে পারেনি নাসিমকে

আক্তার ঢালি হত্যার আগের দিন, ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ার ফরমাইশখানায় নিজ বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হন নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম (৪৫)।

নাসিম পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা ছিলেন বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার তথ্যও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, তার সঙ্গে অস্ত্রধারী বডিগার্ড থাকতেন।

তারপরও বাড়ির সামনে চা খেতে বেরিয়ে গুলির শিকার হন তিনি। প্রত্যক্ষ হামলা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী রাখার পরও যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।

কলেজ গেটে সকালে গুলি

এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ৭ অক্টোবর সকালে দৌলতপুরের বিএল কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম (২৫)।

আনুমানিক সকাল ৭টার দিকে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পরে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

মহিদুল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বনগাঁ গ্রামের শওকত খাঁর ছেলে। তিনি তেলের গাড়িতে কাজ করতেন। তবে কারা তাকে গুলি করেছে এবং হামলার কারণ কী, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

হত্যাকাণ্ড নয়, তবে জনবহুল এলাকায় সকালবেলা একজন যুবক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

আগস্ট-সেপ্টেম্বরে একের পর এক ঘটনা

খুলনায় সহিংসতার চিত্র শুধু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়।

গত ১১ আগস্ট রূপসার নৈহাটি ইউনিয়নের একটি ইটভাটার অফিসের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় ফখরুল শেখ (৩২) নামের এক যুবককে।

১৫ আগস্ট জয় ঢালিকে হত্যা করা হয়। ১৮ আগস্ট রাতে নৈহাটি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মামুন মীর (৩৫)। সংকটজনক অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকার ৩৫ দিন পর তার মৃত্যু হয়। একই রাতে নগরীর রায়েরমহল এলাকায় শিশু অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত হন রাজু (২৬)।

১৯ আগস্ট লবণচরার আশীবিঘা এলাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে নিহত হন মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল (১৮)। মঞ্জুরুলকে গুলি ও ছুরিকাঘাতের পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে একই এলাকায় নাজমুলের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

২০ আগস্ট বটিয়াঘাটা বাজারসংলগ্ন কাজীবাছা নদী থেকে অজ্ঞাত এক তরুণীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দিঘলিয়ার গাজীরহাট হাজী নঈম উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাথরুম থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়।

২৮ সেপ্টেম্বর ভোরে রূপসার ইলাইপুর গ্রামের মোমিনবাগ এলাকায় একটি মাছের ঘের থেকে বাপ্পি (৩৫) ওরফে কলম বাপ্পির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে নদী ও জলাশয় থেকে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।

জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ

রূপসায় ছেলে হত্যার মাত্র ৫১ দিনের মাথায় বাবাকে হত্যার ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে জামিনে থাকা আসামিদের নজরদারির প্রশ্ন।

আক্তার ঢালির স্বজনদের অভিযোগ, জয় ঢালি হত্যার মামলার কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এলাকায় ফিরে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দিচ্ছিলেন।

পুলিশের অভিযানে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও ডাকাতি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের এটিও একটি কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আতঙ্কে নীরব ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা

একটি হত্যাকাণ্ডের পর শুধু নিহতের পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে বা মামলা চালিয়ে যেতে ভয় পায়। প্রত্যক্ষদর্শীরাও তথ্য দিতে অনীহা দেখান।

পুলিশ সাধারণ মানুষকে অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানালেও তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আক্তার ঢালির ঘটনা সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে।

তিনি নিজেই থানায় গিয়ে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।

মাদক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব বড় কারণ

কেএমপির পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের পাশাপাশি মাদক এবং আধিপত্য বিস্তার বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনায় মাদক ব্যবসা ও এলাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বিরোধ বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙে গিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই তীব্র হয়েছে বলেও তাদের দাবি।

তবে এসব দাবির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অপরাধ বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, মাদক, স্থানীয় আধিপত্য ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের কারণগুলো বহুমাত্রিক।

বিশেষ অভিযান শুরু

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। রূপসায় জয় ঢালি ও তার বাবা আক্তার ঢালি এবং দিঘলিয়ায় নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম হত্যাকাণ্ডের পর রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে।

কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন, ভারপ্রাপ্ত) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক টিম কাজ করছে। সন্ত্রাসী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এসআরবি-৬-এর কমান্ডিং অফিসার নিস্তার আহমেদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ত্রাসী গ্রুপের অনলাইন তৎপরতা ও হুমকির ঘটনায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান চলছে।

‘বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধ কমবে না’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মোহাম্মদ সামিউল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনায় সহিংস ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। নৈতিক অবক্ষয়, কিশোর গ্যাং, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরোধ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতা—সবকিছু মিলিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

তার মতে, অতীতে সংঘটিত অপরাধের সঠিক বিচার এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের মাত্রা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আরও সক্রিয় হতে হবে।

প্রশ্নটা নিরাপত্তার

খুলনায় হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান বাড়ছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে উঠছে নিরাপত্তার প্রশ্ন।

যে ব্যক্তি নিজের জীবনের আশঙ্কা জানিয়ে থানায় জিডি করেন, তিনি যদি কিছুদিন পরই খুন হন; যার পাশে অস্ত্রধারী বডিগার্ড থাকে, তাকেও যদি বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়; আর সকালে কলেজের গেটে একজন যুবক গুলিবিদ্ধ হন—তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

প্রশ্ন তাই শুধু ৭২টি হত্যাকাণ্ডের নয়। প্রশ্ন হলো, আগাম হুমকি বা বিরোধের তথ্য পাওয়ার পর তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীদের ওপর নজরদারি কতটা হচ্ছে? আর যারা পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইছেন, তাদের নিরাপত্তার দায় কে নেবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, বিচার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তা না হলে খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মানুষের আতঙ্কও বাড়তেই থাকবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Din Mohammad

জনপ্রিয়

গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা ও সড়ক নিরাপত্তায় প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপ

চলতি বছরে নগরীসহ জেলায় ৭২ খুন

জিডি করেও রক্ষা নেই, বডিগার্ড রেখেও বাঁচা দায়—খুলনায় থামছে না হত্যার মিছিল

Update Time : ১০:৪২:০০ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রাণনাশের আশঙ্কা করেছিলেন আক্তার ঢালি। ছেলে হত্যার মামলার আসামিরা জামিনে বেরিয়ে এসে তাকে ও তার পরিবারের সদস্যদের হুমকি দিচ্ছে—এমন অভিযোগ জানিয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন তিনি। স্থানীয় নেতাদের পাশাপাশি পুলিশের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন। কিন্তু নিরাপত্তার আবেদন জানানোর ১৫ দিনের মধ্যেই গুলিতে প্রাণ হারান আক্তার ঢালি।

দিঘলিয়ায় আবার অস্ত্রধারী বডিগার্ড সঙ্গে থাকা সত্ত্বেও বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হয়েছেন পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম। এসব ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ৭ অক্টোবর সকালে দৌলতপুরের ব্রজলাল কলেজের (বিএল কলেজ) দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়েছেন মহিদুল ইসলাম (২৫) নামে এক যুবক।

একজন নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েও রক্ষা পাননি। আরেকজনের পাশে ছিল অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী। তারপরও প্রকাশ্য হামলা ঠেকানো যায়নি। সাম্প্রতিক এসব ঘটনা খুলনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—হুমকি বা অপরাধের পূর্বাভাস থাকার পরও সহিংসতা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা কোথায়?

নগরী-জেলায় ৭২ হত্যাকাণ্ড

পুলিশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৫ অক্টোবর পর্যন্ত খুলনা মহানগর ও জেলায় অন্তত ৭২টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব হত্যাকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য অংশ ঘটেছে প্রকাশ্যে। গুলি, কুপিয়ে হত্যা, শ্বাসরোধ ও গণপিটুনিসহ বিভিন্ন ঘটনায় প্রাণ গেছে মানুষের।

পুলিশের হিসাবে, এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ২৫টির রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে। তবে সব মামলার তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রম একই পর্যায়ে নেই।

খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মহানগরীতে ৩৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ২৩টি। একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি মামলা হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের তুলনায় মামলার সংখ্যা কম। পুলিশের হিসাবে, ১৯টি মামলার রহস্য উদ্ঘাটন হয়েছে এবং এসব মামলায় ৮১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, রহস্য উদ্ঘাটন হওয়া ১৯টি মামলার মধ্যে ১৭টি তদন্তাধীন এবং দুটি বিচারাধীন। ১৪টি মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নয়টি হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধ। সাতটি ঘটনায় মাদক ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্ব, দুটি ঘটনায় ইজিবাইক চুরি এবং একটি ঘটনায় চোর সন্দেহে গণপিটুনির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জেলা পুলিশের পরিসংখ্যানে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৫টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে গুলিতে নয়জন, মাদক-সংক্রান্ত ঘটনায় কুপিয়ে তিনজন, সামাজিক ও জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধে ১৩ জন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে দুজন, অজ্ঞাত ঘটনায় দুজন, শ্বাসরোধে দুজন এবং পারিবারিক বিরোধে চারজন নিহত হয়েছেন।

নিরাপত্তা চেয়েও বাঁচতে পারেননি আক্তার ঢালি

রূপসার আক্তার ঢালির হত্যাকাণ্ডটি সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তুলেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।

গত ১৫ আগস্ট রূপসার আইচগাতী এলাকায় নৃশংসভাবে গলাকেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় তার ছেলে জয় ঢালিকে। এ ঘটনায় জয় ঢালির মা নাসিমা বেগম ১৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন।

এরপর মামলার এজাহারভুক্ত আসামি মুনজিল শেখ, মুরাদ শেখ, মাসুদ মোল্লা ও রোপা মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় বিএনপি নেতাদের পাশাপাশি রূপসা পুলিশের সহযোগিতাও চেয়েছিলেন আক্তার ঢালি ও তার পরিবার।

পরে ২১ সেপ্টেম্বর রূপসা থানায় জিডি করেন আক্তার ঢালি।

জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, তার ছেলে জয় ঢালি হত্যার মামলার আসামিরা হাইকোর্ট থেকে জামিনে এলাকায় ফিরে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য তার ও পরিবারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। জানমালের ক্ষতি করার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন।

কিন্তু জিডি করার ১৫ দিনের মাথায়, গত ৫ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রূপসার দুর্জনীমহল শহীদের মোড়ের ঢালি বাড়িতে গুলি করে হত্যা করা হয় আক্তার ঢালিকে।

রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আনোয়ার জাহিদ আক্তার ঢালির জিডির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, কী কারণে এবং কারা তাকে গুলি করে হত্যা করেছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

বডিগার্ডও ঠেকাতে পারেনি নাসিমকে

আক্তার ঢালি হত্যার আগের দিন, ৪ অক্টোবর দিঘলিয়ার ফরমাইশখানায় নিজ বাড়ির সামনে গুলিতে নিহত হন নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম (৪৫)।

নাসিম পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির আঞ্চলিক নেতা ছিলেন বলে জানা গেছে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকার তথ্যও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য, তার সঙ্গে অস্ত্রধারী বডিগার্ড থাকতেন।

তারপরও বাড়ির সামনে চা খেতে বেরিয়ে গুলির শিকার হন তিনি। প্রত্যক্ষ হামলা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য ব্যক্তিগত নিরাপত্তাকর্মী রাখার পরও যদি এমন ঘটনা ঘটে, তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে।

কলেজ গেটে সকালে গুলি

এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ৭ অক্টোবর সকালে দৌলতপুরের বিএল কলেজের দ্বিতীয় গেট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মহিদুল ইসলাম (২৫)।

আনুমানিক সকাল ৭টার দিকে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করে পালিয়ে যায় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পরে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

মহিদুল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার বনগাঁ গ্রামের শওকত খাঁর ছেলে। তিনি তেলের গাড়িতে কাজ করতেন। তবে কারা তাকে গুলি করেছে এবং হামলার কারণ কী, তাৎক্ষণিকভাবে তা জানা যায়নি।

হত্যাকাণ্ড নয়, তবে জনবহুল এলাকায় সকালবেলা একজন যুবক গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে।

আগস্ট-সেপ্টেম্বরে একের পর এক ঘটনা

খুলনায় সহিংসতার চিত্র শুধু সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় সীমাবদ্ধ নয়।

গত ১১ আগস্ট রূপসার নৈহাটি ইউনিয়নের একটি ইটভাটার অফিসের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় ফখরুল শেখ (৩২) নামের এক যুবককে।

১৫ আগস্ট জয় ঢালিকে হত্যা করা হয়। ১৮ আগস্ট রাতে নৈহাটি এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন মামুন মীর (৩৫)। সংকটজনক অবস্থায় ঢাকায় চিকিৎসাধীন থাকার ৩৫ দিন পর তার মৃত্যু হয়। একই রাতে নগরীর রায়েরমহল এলাকায় শিশু অপহরণের চেষ্টার অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত হন রাজু (২৬)।

১৯ আগস্ট লবণচরার আশীবিঘা এলাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে গুলিতে নিহত হন মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল (১৮)। মঞ্জুরুলকে গুলি ও ছুরিকাঘাতের পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পরে একই এলাকায় নাজমুলের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

২০ আগস্ট বটিয়াঘাটা বাজারসংলগ্ন কাজীবাছা নদী থেকে অজ্ঞাত এক তরুণীর ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিন দিঘলিয়ার গাজীরহাট হাজী নঈম উদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাথরুম থেকে হাত-পা ও মুখ বাঁধা অবস্থায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রীকে উদ্ধার করা হয়।

২৮ সেপ্টেম্বর ভোরে রূপসার ইলাইপুর গ্রামের মোমিনবাগ এলাকায় একটি মাছের ঘের থেকে বাপ্পি (৩৫) ওরফে কলম বাপ্পির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

এ ছাড়া বছরের বিভিন্ন সময়ে নদী ও জলাশয় থেকে অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও ঘটেছে।

জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ

রূপসায় ছেলে হত্যার মাত্র ৫১ দিনের মাথায় বাবাকে হত্যার ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে জামিনে থাকা আসামিদের নজরদারির প্রশ্ন।

আক্তার ঢালির স্বজনদের অভিযোগ, জয় ঢালি হত্যার মামলার কয়েকজন আসামি উচ্চ আদালত থেকে জামিনে এলাকায় ফিরে এসে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য চাপ ও হুমকি দিচ্ছিলেন।

পুলিশের অভিযানে একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজি ও ডাকাতি মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করা হলেও তাদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের এটিও একটি কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আতঙ্কে নীরব ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা

একটি হত্যাকাণ্ডের পর শুধু নিহতের পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে বা মামলা চালিয়ে যেতে ভয় পায়। প্রত্যক্ষদর্শীরাও তথ্য দিতে অনীহা দেখান।

পুলিশ সাধারণ মানুষকে অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানালেও তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আক্তার ঢালির ঘটনা সেই প্রশ্নটিই সামনে এনেছে।

তিনি নিজেই থানায় গিয়ে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।

মাদক ও আধিপত্যের দ্বন্দ্ব বড় কারণ

কেএমপির পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পেছনে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত বিরোধের পাশাপাশি মাদক এবং আধিপত্য বিস্তার বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনায় মাদক ব্যবসা ও এলাকার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন গ্রুপের মধ্যে বিরোধ বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো ভেঙে গিয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই তীব্র হয়েছে বলেও তাদের দাবি।

তবে এসব দাবির সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অপরাধ বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, পারিবারিক কলহ, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ, পূর্বশত্রুতা, মাদক, স্থানীয় আধিপত্য ও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে হত্যাকাণ্ডের কারণগুলো বহুমাত্রিক।

বিশেষ অভিযান শুরু

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানিয়েছেন, জেলায় বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। রূপসায় জয় ঢালি ও তার বাবা আক্তার ঢালি এবং দিঘলিয়ায় নাসিমুল গণি ওরফে নাসিম হত্যাকাণ্ডের পর রূপসা, তেরখাদা, দিঘলিয়া ও বটিয়াঘাটা থানাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে।

কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন, ভারপ্রাপ্ত) এম এম শাকিলুজ্জামান বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একাধিক টিম কাজ করছে। সন্ত্রাসী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

এসআরবি-৬-এর কমান্ডিং অফিসার নিস্তার আহমেদ বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সন্ত্রাসী গ্রুপের অনলাইন তৎপরতা ও হুমকির ঘটনায় গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অভিযান চলছে।

‘বিচার নিশ্চিত না হলে অপরাধ কমবে না’

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক মোহাম্মদ সামিউল হক বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে খুলনায় সহিংস ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। নৈতিক অবক্ষয়, কিশোর গ্যাং, স্থানীয় আধিপত্যের লড়াই, মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিরোধ এবং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শত্রুতা—সবকিছু মিলিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটছে।

তার মতে, অতীতে সংঘটিত অপরাধের সঠিক বিচার এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধের মাত্রা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে আরও সক্রিয় হতে হবে।

প্রশ্নটা নিরাপত্তার

খুলনায় হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যান বাড়ছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে উঠছে নিরাপত্তার প্রশ্ন।

যে ব্যক্তি নিজের জীবনের আশঙ্কা জানিয়ে থানায় জিডি করেন, তিনি যদি কিছুদিন পরই খুন হন; যার পাশে অস্ত্রধারী বডিগার্ড থাকে, তাকেও যদি বাড়ির সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়; আর সকালে কলেজের গেটে একজন যুবক গুলিবিদ্ধ হন—তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

প্রশ্ন তাই শুধু ৭২টি হত্যাকাণ্ডের নয়। প্রশ্ন হলো, আগাম হুমকি বা বিরোধের তথ্য পাওয়ার পর তা প্রতিরোধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? জামিনে বেরিয়ে আসা অপরাধীদের ওপর নজরদারি কতটা হচ্ছে? আর যারা পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাইছেন, তাদের নিরাপত্তার দায় কে নেবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, বিচার নিশ্চিত করা এবং একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তথ্যদাতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তা না হলে খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে মানুষের আতঙ্কও বাড়তেই থাকবে।