ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপও বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এ সময়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও চিকিৎসাসেবা নিয়ে অভিযোগ, কোথাও আইসিইউ শয্যা না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বজনেরা। তবে এসব মৃত্যুর কতটি সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা এই প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মৃত্যুর ঘটনা ও পরিবারের দাবি:
গত ২০ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে নুসরাত নামে এক নারী মারা গেছেন বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। পরিবারের দাবি, তাঁর গর্ভের সন্তানকেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মায়ের মৃত্যুতে অন্য সন্তানদের জীবনেও নেমে এসেছে গভীর শূন্যতা।
একই দিন ভোরে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে সুমাইয়া নামে সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা আরেক নারী মারা গেছেন বলে তাঁর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুমাইয়ার বাবা-মাও তখন অসুস্থ ছিলেন। তাঁর মা ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, আর বাবা বাসায় স্যালাইন নিচ্ছিলেন।
পরিবারের দাবি, জ্বর নিয়ে বাড়িতে থাকা সুমাইয়ার ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে হঠাৎ রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা আইসিইউতে ভর্তির পরামর্শ দেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতভর চেষ্টা করেও আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। চিকিৎসা সংকটের মধ্যেই সুমাইয়ার মৃত্যু হয় বলেও তাঁরা দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, নুসরাতকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্যও রাতভর বিভিন্ন হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খোঁজা হয়েছিল বলে তাঁর স্বজনেরা জানিয়েছেন। কোথাও শয্যা না পেয়ে তাঁকে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন পরিবারের সদস্যরা। পরিবারের দাবি, ভাঙা পর্যন্ত পৌঁছানোর পর তাঁর মৃত্যু হয়।
এই দুটি ঘটনা সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে। তবে তাঁদের বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই, চিকিৎসা নথি পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
সরকারি পরিসংখ্যান:
নুসরাত ও সুমাইয়ার পরিবারের সদস্যদের দাবি, গত দুই দিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও খুলনা সিটি করপোরেশনের ডেঙ্গুতে মৃত্যুর তথ্যে তাঁদের নাম পাওয়া যায়নি। তবে সরকারি সংস্থাগুলোর সংশ্লিষ্ট নথি, মৃত্যুর শ্রেণিবিন্যাস এবং তথ্য অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তাই তাঁদের মৃত্যুর ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
তবে যদি কোনো মৃত্যুর তথ্য সরকারি হিসাবে অন্তর্ভুক্ত না হয়ে থাকে, তার কারণ কী—তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কত মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, কতজন সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে যাচ্ছেন এবং কতজন চিকিৎসার অভাবে বা আইসিইউ সংকটে মারা যাচ্ছেন—এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও নিয়মিত তথ্য প্রকাশিত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
চিকিৎসা ও নগর ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন:
একটি বিভাগীয় শহরে জরুরি মুহূর্তে আইসিইউ শয্যা না পাওয়ার অভিযোগ চিকিৎসাব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো মৌসুমি রোগের প্রকোপ সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা থাকার পরও পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে চিকিৎসা সংকটের নির্দিষ্ট কারণ, আইসিইউ শয্যার প্রাপ্যতা এবং দায় নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জরুরি।
মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জমে থাকা পানি অপসারণ, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতার পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত শয্যা ও আইসিইউ প্রস্তুত রাখা—এসব ব্যবস্থা সমন্বিতভাবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে সংক্রমণ, মৃত্যুর কারণ, হাসপাতালের সক্ষমতা এবং নগর ব্যবস্থাপনার তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
একদিকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ, অন্যদিকে চিকিৎসা ও আইসিইউ সংকট—দুই দিক থেকেই চাপ তৈরি হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। তবে কোনো নির্দিষ্ট মৃত্যুকে চিকিৎসার অভাব বা আইসিইউ সংকটের সরাসরি ফল হিসেবে চিহ্নিত করতে চিকিৎসা নথি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রয়োজন।
প্রশ্ন তাই একটাই—ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাগুলো কতটা প্রস্তুত?
ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগে থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়ার পর কেন হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে—এ প্রশ্নের উত্তর প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া দরকার।
কত মানুষ আক্রান্ত হলে, কত পরিবার স্বজন হারালে এবং কত রোগী আইসিইউ না পেয়ে সংকটে পড়লে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে—এটি এখন জনস্বাস্থ্য নীতির পাশাপাশি প্রশাসনিক জবাবদিহিরও প্রশ্ন।
ডেঙ্গু এখন শুধু স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়—এটি নগর ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা অবকাঠামো এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতিরও বড় পরীক্ষা।
নিজস্ব প্রতিবেদক, খুলনা 























