এমপিওভুক্তদের নতুন শর্তের বেড়াজালে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না : হাইকোর্ট

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ০২:২৭:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬
  • 148

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় যে বিধিমালা কার্যকর ছিল, তা উপেক্ষা করে পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো শর্ত আরোপ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্জিত আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

মো. আবু হানিফ ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য শীর্ষক মামলায় চার শিক্ষকের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত ৩০ জুন দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত হয়। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি উর্মি রহমান।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রবিধান অনুসরণ করে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রোজি মোজাম্মেল মহিলা কলেজে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমাজকল্যাণ বিভাগে প্রভাষক (তৃতীয় শিক্ষক) পদে মো. আবু হানিফসহ চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর নিয়োগ পাওয়ার পরদিন তারা কর্মস্থলে যোগ দেন।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এনটিআরসিএ পরিপত্রের আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকাশিত ৭২৬ জন শিক্ষকের তালিকায় এই চার শিক্ষকের নামও ছিল।

তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইন প্রক্রিয়ায় তাদের এমপিও আবেদন ‘এনটিআরসিএ সনদ নেই’—এই কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয়। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন চার শিক্ষক।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, প্রশাসনিক প্রয়োজনে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ চাকরির বিধিমালা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত বিধিমালা প্রয়োগ করে আগে থেকেই চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মচারীর অর্জিত অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।

আদালত বলেন, ২০১৫ সালে ওই চার শিক্ষককে নিয়োগের সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় এনটিআরসিএ সনদের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকদের জন্য এনটিআরসিএ সনদের শর্ত ২০১৯ সালের প্রবিধানে প্রথম যুক্ত হয়। ফলে পরবর্তী সময়ের এই শর্ত ২০১৫ সালে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা আইনসংগত নয়।

তৃতীয় শিক্ষক পদ জনবল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়—রাষ্ট্রপক্ষের এমন দাবিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দেন আদালত। কারণ, সরকার নিজেই বিভিন্ন পরিপত্রের মাধ্যমে তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিও সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

হাইকোর্ট আরও বলেন, এমপিও প্রদান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও যুক্তিসঙ্গত আইনি ভিত্তি ছাড়া খেয়ালখুশি বা স্বেচ্ছাচারীভাবে তা করা হলে বিষয়টি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারযোগ্য।

চূড়ান্ত রায়ে এনটিআরসিএ সনদ না থাকার অজুহাতে চার প্রভাষকের এমপিও আবেদন প্রত্যাখ্যানের অনলাইন সিদ্ধান্ত বাতিল করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে তাদের এমপিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে প্রাপ্য সব বকেয়াসহ চার রিটকারীকে আর্থিক সুবিধা পরিশোধের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Din Mohammad

জনপ্রিয়

ডেঙ্গু প্রতিরোধে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

এমপিওভুক্তদের নতুন শর্তের বেড়াজালে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না : হাইকোর্ট

Update Time : ০২:২৭:২২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১০ অগাস্ট ২০২৬

বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় যে বিধিমালা কার্যকর ছিল, তা উপেক্ষা করে পরবর্তী সময়ে নতুন কোনো শর্ত আরোপ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের অর্জিত আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

মো. আবু হানিফ ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য শীর্ষক মামলায় চার শিক্ষকের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে এ রায় দেন বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার ও বিচারপতি উর্মি রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। গত ৩০ জুন দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সোমবার (১০ আগস্ট) প্রকাশিত হয়। রায়ের মূল অংশ লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি উর্মি রহমান।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ভিত্তিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রবিধান অনুসরণ করে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রোজি মোজাম্মেল মহিলা কলেজে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমাজকল্যাণ বিভাগে প্রভাষক (তৃতীয় শিক্ষক) পদে মো. আবু হানিফসহ চারজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর নিয়োগ পাওয়ার পরদিন তারা কর্মস্থলে যোগ দেন।

পরবর্তীতে ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বরের এনটিআরসিএ পরিপত্রের আগে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের প্রকাশিত ৭২৬ জন শিক্ষকের তালিকায় এই চার শিক্ষকের নামও ছিল।

তবে চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইন প্রক্রিয়ায় তাদের এমপিও আবেদন ‘এনটিআরসিএ সনদ নেই’—এই কারণ দেখিয়ে বাতিল করা হয়। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করেন চার শিক্ষক।

রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেন, প্রশাসনিক প্রয়োজনে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ চাকরির বিধিমালা পরিবর্তন বা পরিমার্জন করতে পারে। তবে পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত বিধিমালা প্রয়োগ করে আগে থেকেই চাকরিতে যোগ দেওয়া কর্মচারীর অর্জিত অধিকার কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন করা যাবে না।

আদালত বলেন, ২০১৫ সালে ওই চার শিক্ষককে নিয়োগের সময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় এনটিআরসিএ সনদের কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না। ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকদের জন্য এনটিআরসিএ সনদের শর্ত ২০১৯ সালের প্রবিধানে প্রথম যুক্ত হয়। ফলে পরবর্তী সময়ের এই শর্ত ২০১৫ সালে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা আইনসংগত নয়।

তৃতীয় শিক্ষক পদ জনবল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত নয়—রাষ্ট্রপক্ষের এমন দাবিও গ্রহণযোগ্য নয় বলে মত দেন আদালত। কারণ, সরকার নিজেই বিভিন্ন পরিপত্রের মাধ্যমে তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিও সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

হাইকোর্ট আরও বলেন, এমপিও প্রদান সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হলেও যুক্তিসঙ্গত আইনি ভিত্তি ছাড়া খেয়ালখুশি বা স্বেচ্ছাচারীভাবে তা করা হলে বিষয়টি সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে বিচারযোগ্য।

চূড়ান্ত রায়ে এনটিআরসিএ সনদ না থাকার অজুহাতে চার প্রভাষকের এমপিও আবেদন প্রত্যাখ্যানের অনলাইন সিদ্ধান্ত বাতিল করেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে তাদের এমপিও তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে প্রাপ্য সব বকেয়াসহ চার রিটকারীকে আর্থিক সুবিধা পরিশোধের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবসহ সংশ্লিষ্ট বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।