রাজশাহীতে সার সংকট, আলু চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৭:৩৩:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ নভেম্বর ২০২২
  • 260

রাজশাহী প্রতিনিধি
রবি মৌসুমের শুরুতেই রাজশাহীতে সারের সংকট দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চাষিরা বলছেন, সার সংকট তৈরি করে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রায় দ্বিগুণ দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে পটাশ সারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এতে কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
তবে ডিলাররা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছুটা সংকট আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নভেম্বর মাস আলু চাষের সময়। কেউ কেউ চাষ শুরু করে দিয়েছেন। তবে অনেকে জমি প্রস্তুত করেই সারের অভাবে থমকে আছেন। আবার কেউ সার না পেয়ে চাষ বন্ধ রেখেছেন।
চাষিরা জানান, ৭৫০ টাকার পটাশ সারের বস্তা কিনতে এখন ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত দামে সার কিনতে গিয়েও দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘ লাইনে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়েও পরিমাণ মতো সার মিলছে না। এতে আসন্ন রবি মৌসুমে আলু চাষসহ অন্যান্য সবজি চাষ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
কথা হয় জেলার তানোর উপজেলার পাঁচন্দর এলাকার আলু চাষি আফজাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আলু লাগানোর জন্য জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। সপ্তাখানেকের ভেতরেই পুরোদমে আলু রোপণ শুরু হবে। গত মৌসুমে স্টোরে ওভারলোড হওয়ায় কৃষকের আমাদের ক্ষতি হয়েছে। যে আলুর দাম ৬০ টাকা কেজি, সেটা ৫০ টাকাতেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে ইদানীং এখানে ব্যাপকহারে সারের সংকট দেখা দিয়েছে। লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে সার সংকটের কারণে আলু চাষ করছেন না উপজেলার কালিগঞ্জ এলাকার শরিফ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আলু চাষে অনেক খরচ, সার পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। খরচও অনেক। ডিলার ছাড়া কোনো মাধ্যমে পটাশ পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর ৫০ বিঘা জমিতে চাষ করছিলাম, এবার একটুও করবো না।
তিনি আরও বলেন, ডিলারের মাধ্যমে যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে ততটুকু দিয়ে আসলে আলু হয় না। সরকারিভাবে প্রতি বিঘা আলুর জমিতে ৪০ কেজি পটাশ দিতে বলা হয়। কিন্তু প্রতি বিঘায় কমপক্ষে দুই বস্তা পটাশ না দিলে আলুর ভালো ফলন পাওয়া যায় না।
কথা হয় বাগমারা উপজেলা চাষি মাহতাব হোসেনের সঙ্গে। তিনি সারের বাড়তি দাম নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, এবছর সার কেনা বড় দুষ্কর। দাম অনেক বেশি। এখনই ৭৫০ টাকার পটাশ ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। পরবর্তীতে আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। কী করবো বুঝতে পারছি না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, আমরা এগুলো বেসরকারিভাবে কিনে নিয়ে আসি। যেটি আমাদের কিনতেই বেশি লাগে। তাই ১০০০-১১০০ টাকা বস্তা হিসেবে বিক্রি করে থাকি। তবে সরকারি যে পটাশ সার ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি করার কথা সেটিও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সার সংকটের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে অনেকে ১৪০০-১৫০০ টাকা বস্তা বিক্রি করছে।’
গোদাগাড়ী দেওপাড়া ইউনিয়নের সার ডিলার ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি বরাদ্দের পটাশ সার মূলত ৭৫০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নাই। যদি কেউ অভিযোগ দিয়ে থাকে তাহলে এটি একেবারে ভিত্তিহীন। তবে মোটা একটা পটাশ পাওয়া যায় যেটি সরকারি বরাদ্দ নয়, বেসরকারি। এগুলো বাইরে কিনতে পাওয়া যায়। এটির দাম অনেকে বেশি নিচ্ছেন বলে শুনেছি।’
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, অনেকেই সার বেশি ব্যবহার করে। তাদের কথা বিবেচনায় আমরা পটাশ সারের অতিরিক্ত চাহিদা দিয়েছিলাম। সেই অনুযায়ী আমরা বরাদ্দও পেয়েছি। কিন্তু যেখান থেকে বরাদ্দটা নিতে হবে, সেখানে সিরিয়াল জটিলতার কারণে সারটা আসতে একটু সময় লাগছে। তবে এ সপ্তাহের মধ্যেই পুরো সার এলে কৃষকদের আর সমস্যা হবে না। এক সপ্তাহ পর সারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আবু কালাম বলেন, ‘সার যা পেয়েছি এতে সংকট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সারাদেশে একইসঙ্গে সারের চাহিদার কারণে ডেলিভারি পয়েন্টে একটু সমস্যা হচ্ছে। ফলে সংকটও দেখা দিতে পারে কিছু কিছু জায়গায়। তাই হয়তো একটু বাড়তি দামে অনেকেই বিক্রি করছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারি রেটের বাইরে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। সরকারি যত সংস্থা আছে সবাই সার বিক্রি মনিটরিং করে, আমাদের দোকানে বসে থাকে। তবে ডিলার বাইরে যারা সার বিক্রি করছেন তারা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করে থাকতে পারে। আর লোকবল সংকটের কারণে সরকারি কর্মকর্তারাও সেভাবে তদারকি করতে পারছেন না।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোজদার হোসেন বলেন, সার সংকট বা দাম বৃদ্ধির কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা মাঠ পরিদর্শনেও গিয়েছি, এরকম কিছু কেউ বলেনি।

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Deen Md

রাজশাহীতে সার সংকট, আলু চাষ নিয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক

Update Time : ০৭:৩৩:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২০ নভেম্বর ২০২২

রাজশাহী প্রতিনিধি
রবি মৌসুমের শুরুতেই রাজশাহীতে সারের সংকট দেখা দিয়েছে। একইসঙ্গে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। চাষিরা বলছেন, সার সংকট তৈরি করে ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা প্রায় দ্বিগুণ দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে পটাশ সারের সরবরাহ চাহিদার তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এতে কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ।
তবে ডিলাররা বলছেন, সরকার নির্ধারিত দামের বেশি নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছুটা সংকট আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নভেম্বর মাস আলু চাষের সময়। কেউ কেউ চাষ শুরু করে দিয়েছেন। তবে অনেকে জমি প্রস্তুত করেই সারের অভাবে থমকে আছেন। আবার কেউ সার না পেয়ে চাষ বন্ধ রেখেছেন।
চাষিরা জানান, ৭৫০ টাকার পটাশ সারের বস্তা কিনতে এখন ১০০০ থেকে ১৫০০ টাকা গুনতে হচ্ছে। আবার অতিরিক্ত দামে সার কিনতে গিয়েও দাঁড়াতে হচ্ছে দীর্ঘ লাইনে। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়েও পরিমাণ মতো সার মিলছে না। এতে আসন্ন রবি মৌসুমে আলু চাষসহ অন্যান্য সবজি চাষ নিয়ে দেখা দিয়েছে শঙ্কা।
কথা হয় জেলার তানোর উপজেলার পাঁচন্দর এলাকার আলু চাষি আফজাল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, আলু লাগানোর জন্য জমি প্রস্তুত করা হচ্ছে। সপ্তাখানেকের ভেতরেই পুরোদমে আলু রোপণ শুরু হবে। গত মৌসুমে স্টোরে ওভারলোড হওয়ায় কৃষকের আমাদের ক্ষতি হয়েছে। যে আলুর দাম ৬০ টাকা কেজি, সেটা ৫০ টাকাতেই পাওয়া যাচ্ছে। তবে ইদানীং এখানে ব্যাপকহারে সারের সংকট দেখা দিয়েছে। লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে চাহিদা মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না।
এদিকে সার সংকটের কারণে আলু চাষ করছেন না উপজেলার কালিগঞ্জ এলাকার শরিফ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আলু চাষে অনেক খরচ, সার পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। খরচও অনেক। ডিলার ছাড়া কোনো মাধ্যমে পটাশ পাওয়া যাচ্ছে না। গত বছর ৫০ বিঘা জমিতে চাষ করছিলাম, এবার একটুও করবো না।
তিনি আরও বলেন, ডিলারের মাধ্যমে যতটুকু পাওয়া যাচ্ছে ততটুকু দিয়ে আসলে আলু হয় না। সরকারিভাবে প্রতি বিঘা আলুর জমিতে ৪০ কেজি পটাশ দিতে বলা হয়। কিন্তু প্রতি বিঘায় কমপক্ষে দুই বস্তা পটাশ না দিলে আলুর ভালো ফলন পাওয়া যায় না।
কথা হয় বাগমারা উপজেলা চাষি মাহতাব হোসেনের সঙ্গে। তিনি সারের বাড়তি দাম নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, এবছর সার কেনা বড় দুষ্কর। দাম অনেক বেশি। এখনই ৭৫০ টাকার পটাশ ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। পরবর্তীতে আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। কী করবো বুঝতে পারছি না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক খুচরা সার বিক্রেতা বলেন, আমরা এগুলো বেসরকারিভাবে কিনে নিয়ে আসি। যেটি আমাদের কিনতেই বেশি লাগে। তাই ১০০০-১১০০ টাকা বস্তা হিসেবে বিক্রি করে থাকি। তবে সরকারি যে পটাশ সার ৭৫০ টাকা দরে বিক্রি করার কথা সেটিও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। সার সংকটের সুযোগটা কাজে লাগিয়ে অনেকে ১৪০০-১৫০০ টাকা বস্তা বিক্রি করছে।’
গোদাগাড়ী দেওপাড়া ইউনিয়নের সার ডিলার ডা. মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি বরাদ্দের পটাশ সার মূলত ৭৫০ টাকা বস্তা দরে বিক্রি হচ্ছে। বেশি দামে বিক্রির সুযোগ নাই। যদি কেউ অভিযোগ দিয়ে থাকে তাহলে এটি একেবারে ভিত্তিহীন। তবে মোটা একটা পটাশ পাওয়া যায় যেটি সরকারি বরাদ্দ নয়, বেসরকারি। এগুলো বাইরে কিনতে পাওয়া যায়। এটির দাম অনেকে বেশি নিচ্ছেন বলে শুনেছি।’
তানোর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ আহমেদ বলেন, অনেকেই সার বেশি ব্যবহার করে। তাদের কথা বিবেচনায় আমরা পটাশ সারের অতিরিক্ত চাহিদা দিয়েছিলাম। সেই অনুযায়ী আমরা বরাদ্দও পেয়েছি। কিন্তু যেখান থেকে বরাদ্দটা নিতে হবে, সেখানে সিরিয়াল জটিলতার কারণে সারটা আসতে একটু সময় লাগছে। তবে এ সপ্তাহের মধ্যেই পুরো সার এলে কৃষকদের আর সমস্যা হবে না। এক সপ্তাহ পর সারের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশন (বিএফএ) রাজশাহী জেলা শাখার সভাপতি আবু কালাম বলেন, ‘সার যা পেয়েছি এতে সংকট হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সারাদেশে একইসঙ্গে সারের চাহিদার কারণে ডেলিভারি পয়েন্টে একটু সমস্যা হচ্ছে। ফলে সংকটও দেখা দিতে পারে কিছু কিছু জায়গায়। তাই হয়তো একটু বাড়তি দামে অনেকেই বিক্রি করছেন।
তিনি আরও বলেন, সরকারি রেটের বাইরে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। সরকারি যত সংস্থা আছে সবাই সার বিক্রি মনিটরিং করে, আমাদের দোকানে বসে থাকে। তবে ডিলার বাইরে যারা সার বিক্রি করছেন তারা অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি করে থাকতে পারে। আর লোকবল সংকটের কারণে সরকারি কর্মকর্তারাও সেভাবে তদারকি করতে পারছেন না।’
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক (ডিডি) মোজদার হোসেন বলেন, সার সংকট বা দাম বৃদ্ধির কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। আমরা মাঠ পরিদর্শনেও গিয়েছি, এরকম কিছু কেউ বলেনি।